সরণ দ্রুতি ও বেগঃ একক ও পার্থক্য

0
284

পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা স্থিতি, গতি,‌ চলন গতি ও ঘূর্ণন গতি সম্বন্ধে জেনেছিলাম। সরণ দ্রুতি ও বেগ এরা প্রত্যেকেই চলন গতির উদাহরণ। আমরা এই অধ্যায়ের স্মরণ দ্রুতি ও বেগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

সরণ

সরণ কি বা কাকে বলে

ক) একটি নির্দিষ্ট দিকে কোন গতিশীল বস্তুর স্থান পরিবর্তন কি বস্তুটির সরণ বলে।
খ) বস্তুটির প্রথম ও শেষ অবস্থান বিন্দুর মধ্যবর্তী সরল রৈখিক দূরত্ব হলো ঐ বস্তুর সরণের পরিমান।

১. ধরা যাক, একটি গতিশীল বস্তু A বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে ACB বা ADB বা AEB বা AFB পথে চলে B বিন্দুতে এসে থেমেছে। বস্তুকণাটি B বিন্দুতে পৌঁছাতে যে পথ অনুসরণ করুক না কেন তার প্রথম ও শেষ অবস্থান বিন্দুর মধ্যবর্তী সরল রৈখিক দূরত্ব হবে গতিশীল বস্তুর সরণ এর পরিমান। অর্থাৎ যে রাস্তা দিয়েই হোক না কেন কোন বস্তুর যাত্রা শুরুর বিন্দু এবং যাত্রা শেষ বিন্দু সরলরেখা দ্বারা যোগ করলে যে দূরত্ব পাওয়া যায়, সেটি হলো বস্তুর সরণ।

২. আরো একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করি।
একটি বস্তু A থেকে বিয়ের দিকে প্রথমে 4 মিটার দূরত্ব যাওয়ার পর থেকে AB র সঙ্গে লম্ব করে C পর্যন্ত 3 মিটার দূরে গেল। বস্তুটির প্রথম অবস্থান A এবং শেষ অবস্থান C, এখন A এবং C কে একটি সরলরেখা দিয়ে যোগ করলেই সরণ পাওয়া যায়। অতএব বস্তুটির সরণ হল AC।
অর্থাৎ সরণের মান পাওয়া গেল 5 মিটার।

সরণের একক

এস আই পদ্ধতি ও এম কে এস পদ্ধতিতে সরণের একক হল মিটার।
সিজিএস পদ্ধতিতে সরণের একক হল সেন্টিমিটার।
এপিএস পদ্ধতিতে সরণের একক ফুট।

সরণ ও দূরত্বের মধ্যে পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে স্মরণ এবং দূরত্বের মধ্যে পার্থক্য কিছু মনে না হলেও বাস্তবে সরণ ও দূরত্বের মধ্যে পার্থক্য অনেক।
১. কোন বস্তু নির্দিষ্ট অভিমুখে স্থান পরিবর্তন করলে কণাটির প্রথম এবং শেষ অবস্থান একটি সরলরেখা দিয়ে যোগ করে যে দূরত্ব পাওয়া যায় তাকে সরণ বলে। আর বস্তুকণার প্রথম এবং শেষ অবস্থান পরিবর্তনে মোট যতটা পথ অতিক্রম করতে হয় সেই পথকে বস্তুটির দ্বারা অতিক্রান্ত দূরত্ব বলে।
২. সরণ একটি ভেক্টর রাশি কিন্তু দূরত্ব হলো একটি স্কেলার রাশি।

সরণ একটি ভেক্টর রাশি ।

দ্রুতি

দ্রুতির সংজ্ঞা বা কাকে বলে

ক) কোন গতিশীল বস্তু সরল বা বক্র পথে একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে ঐ বস্তুর দ্রুতি বলে।
দ্রুতি একটি স্কেলার রাশি। দ্রুতির শুধুমাত্র মান আছে কিন্তু কোন অভিমুখ নেই তাই একে স্কেলার রাশি বলা হয়।
একটি গাড়ি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার যায়। এটাই হলো গাড়িটির দ্রুতি। গাড়িটি কোন দিকে যাচ্ছে তা বলার প্রয়োজন হয় না।
কোন বস্তু t সেকেন্ড s দূরত্ব অতিক্রম করে তাহলে বস্তুটির দ্রুতি হবে এক সেকেন্ডে s/t দুরত্ব।
দ্রুতির পরিমাপ = s/t
অর্থাৎ বস্তুর দূরত্ব সমান = (অতিক্রান্ত দূরত্ব / সময়)

দ্রুতির একক

এস আই ও এম কে এস পদ্ধতিতে দ্রুতির একক মিটার/সেকেন্ড
সিজিএস পদ্ধতিতে দ্রুতির একক সেন্টিমিটার/সেকেন্ড
এপিএস পদ্ধতিতে দ্রুতির একক ফুট/সেকেন্ড।
উদাহরণ
মনে করি একটি ট্রেন 3 ঘন্টায় 240 কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। তবে ট্রেনটির দ্রুতি হবে 240/3 কিমি/ঘন্টা বা, 80 কিমি/ঘন্টা।

দ্রুতির প্রকারভেদ

দ্রুতির দুই প্রকারের হয়ে থাকে।
১. সমদ্রুতি এবং
২. অসম দ্রুতি

সমদ্রুতি

যদি কোন বস্তু সমান সময়ের ব্যবধানে সর্বদা সমান দূরত্ব অতিক্রম করে তখন, ঐ বস্তুটির গতিকে সমদ্রুতি বলে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে বৃত্তাকার পথে ঘূর্ণায়মান কোন বস্তু যদি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের চাপকে অতিক্রম করে চলতে থাকে তবে বস্তুটিকে সমদ্রুতি সম্পন্ন বলা হবে। যেমন ঘূর্ণায়মান পাখার ব্লেড।

অসম দ্রুতি

যদি কোন বস্তু সমান সময়ের অবকাশে বিভিন্ন দূরত্ব অতিক্রম করে, তবে বস্তুটির গতিকে অসম দ্রুতি বলে।
অসম দ্রুতির ক্ষেত্রে গড় দ্রুতি নির্ণয় করার প্রয়োজন হয়। অসম দ্রুতির সম্পন্ন কোন বস্তু দ্বারা অতিক্রান্ত দূরত্ব সময় দ্বারা ভাগ করলে বস্তুটির গড় দ্রুতি পাওয়া যায়।
অর্থাৎ বস্তুর গড় দ্রুতি = (অতিক্রান্ত দূরত্ব/মোট সময়)।
মনে করে একটি বাইসাইকেল প্রথম ঘণ্টায় 5 কিলোমিটার দ্বিতীয় ঘন্টায় 7 কিলোমিটার এবং তৃতীয় ঘন্টায় 3 কিলোমিটার গেল। এক্ষেত্রে মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব = (5+7+3) = 15 কিলোমিটার এবং মোট সময় = তিন ঘন্টা
সুতরাং, সূত্র অনুসারে বস্তুর গড় দূরত্ব = 15/3 বা, 5 কিলোমিটার/ঘন্টা

পক্ষান্তরে বস্তুর গড় দ্রুতি এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমের জন্য ব্যয়িত সময় জানা থাকলে নির্দিষ্ট দূরত্বটা সহজেই নির্ণয় করা যায়। কারণ মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব = গড় দ্রুতি * সময়

বেগ

বেগের সংজ্ঞা বা বেগ কাকে বলে

কোন গতিশীল বস্তুর সরণের পরিবর্তনের হারকে বেগ বলে। অর্থাৎ একক সময়ে কোন বস্তুর নির্দিষ্ট দিকে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাই ঐ বস্তুর বেগ।
সরণ নির্দেশ করার জন্য মানবিক এর প্রয়োজন হয়, কাজেই বেগ নির্দেশের জন্য মান ও দিকের প্রয়োজন হয় । তাই বেগ একটি ভেক্টর রাশি।
যদি t সময়ে কোন বস্তুর সরণ S হয় এবং বেগ V হয় তবে,

বস্তুর গতি বেগ = (বস্তুর সরণ/সময়)
বা, V = S/t
বা, S + V.t
অর্থাৎ বস্তুর সরণ = বস্তুর বেগ * সময়।

বেগের একক

সিজিএস পদ্ধতিতে বেগের একক সেন্টিমিটার/সেকেন্ড।
এসআই এবং এমকেএস পদ্ধতিতে বেগের একক মিটার/সেকেন্ড।
এপিএস পদ্ধতিতে বেগের একক ফুট/সেকেন্ড
অর্থাৎ দ্রুতি ও বেগকে একই এককের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়।

বেগের প্রকারভেদ

বস্তুর বেগ দুই প্রকারের হয়ে থাকে
১. সমবেগ এবং
২. অসম বেগ

সমবেগ

কোন বস্তুর বেগের মান ও দিক সব সময় অপরিবর্তিত থাকলে বস্তুটির বেগকে সমবেগ বলে। কোন বস্তুর বেগ বলতে আমরা বস্তুর সমবেগকে বুঝে থাকি। যেমন কোন বস্তু ২০ মিটার/সেকেন্ড বেগে সরলরেখা বরাবর চললে বস্তুর এই বেগকে আমরা সমবেগ বলি। এক্ষেত্রে বস্তুর বেগের মান এবং দিক সবসময় স্থির থাকে।

অসম বেগ

যদি কোন বস্তুর বেগের মান কিংবা অভিমুখ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় তবে বস্তুটির বেগকে আমরা অসমবেগ বলি।
যেমন স্থির অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করে কোন বস্তু যদি একই দিকে নির্দিষ্ট ত্বরণে চলে তবে সময়ের সাপেক্ষে ঐ বস্তুর বেগ ক্রমশ বাড়ে ফলে বস্তুটি অসম বেগে চলতে থাকে।

দ্রুতি এবং বেগের মধ্যে পার্থক্য

দ্রুতি এবং বেগ আপেক্ষিকভাবে একই রকম মনে হলেও এদের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর।

দ্রুতিবেগ
কোন বস্তু একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে বস্তুর দ্রুতি বলে।একক সময়ে বস্তুর সরণ কে বস্তুটির বেগ বলে।
দ্রুতির মান আছে কিন্তু অভিমুখ নেই তাই দ্রুত একটি স্কেলার রাশি।কোন বস্তুর বেগ বলার সময় তার মান দিক দুইই নির্দেশ করতে হয় সেজন্য বেগ একটি ভেক্টর রাশি।
কোন বস্তুর সমদ্রুতি সম্পন্ন হলেও সমবেগ সম্পন্ন নাও হতে পারে। কারণ বস্তুটি যদি বৃত্তাকার পথে সমদ্রুতিতে চলে তবে ঐ বস্তুর অভিমুখের পরিবর্তন হয় ফলে বস্তুটিকে সমবেগ সম্পন্ন বলা যায় না।কোন বস্তু সমাবেশ সম্পন্ন হলে তা সমদ্রুতি সম্পন্ন হবে। কারণ দিক অপরিবর্তিত রেখে সমান সমান সমান দূরত্ব অতিক্রম করা কে সমবেগ বলে। আর সমান সময়ে সমান দূরত্ব অতিক্রম করাকে সমদ্রুতি বলে।
কোন গতিশীল বস্তুর দ্রুতির মান কখনো শূন্য হতে পারে নাগতিশীল বস্তুর বেগের মান শূন্য হতে পারে।
মানের পরিবর্তন হলে দ্রুতিরও পরিবর্তন হয়।মান বা দিক উভয়ের পরিবর্তন হলে বেগের পরিবর্তন হয়।
দ্রুতির ইংরাজি প্রতিশব্দ Speedবেগের ইংরাজি প্রতিশব্দ Velocity

প্রশ্নোত্তর

সরণকে ভেক্টর রাশি বলা হয় কেন

সরণ কে নির্দেশ করতে হলে এর মান দিক দুটোকেই নির্দেশ করতে হয়। সরণের মান ও অভিমুখ দুইই আছে । তাই স্মরণ একটি ভেক্টর রাশি। সরনকে দৈর্ঘ্যের এককে প্রকাশ করা হয়।

কোন বস্তু দ্বারা অতিক্রান্ত দূরত্ব শূন্য নয়, কিন্তু ও সরণের মান শূন্য হতে পারে কি?

হ্যাঁ ক্ষেত্রবিশেষে কোন গতিশীল বস্তু ত্বরণের মান শূন্য হতে পারে। ধরি একটি গতিশীল বস্তু সরল রৈখিক পথে A থেকে Bতে এবং B থেকে আবার Aতে ফিরে এলো অতএব সরণ শূন্য হবে। যদিও বস্তুর অতিক্রান্ত দূরত্ব 2AB।
অন্যভাবে কোন গতিশীল বস্তু যদি বৃত্তাকার পথে নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করে এসে পূর্বের স্থানে থেমে যায় তাহলেও তার সরণ শূন্য হবে।
সুতরাং গতিশীল কোন বস্তুর নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলেও বস্তুর সরণ শূন্য হতে পারে।

সমদ্রুতি সম্পন্ন কোন বস্তু কি সব সময় সমবেগ সম্পন্ন হবে

যদি কোন বস্তু আঁকাবাঁকা পথে সামান্য সময়ের ব্যবধানে একই দূরত্ব অতিক্রম করে চলতে থাকে তবে বলা যায় যে বস্তুটি সমদ্রুতিতে চলছে। আঁকাবাঁকা পথ চলার সময় বস্তুটির গতিমুখের পরিবর্তন ঘটে। ফলে ওই বস্তুটিকে সমবেগসম্পন্ন বলা যায় না। কারণ বেগের একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ থাকে।
ধরা যাক একটি খেলনা গাড়ি বৃত্তাকার পথে সমদ্রুতিতে চলছে। বৃত্তাকার পথে চলার ফলে গাড়িটির গতির অভিমুখে ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটবে। অর্থাৎ বৃত্তাকার পথে গাড়িটির গতির অভিমুখে একই না থাকায় বাড়িতেই সমবেগ সম্পন্ন বলা যাবে না। কিন্তু যদি কোন বস্তুর নির্দিষ্ট অভিমুখে সমদ্রুতিতে চলতে থাকে তবে ওই বস্তুটির সমবেগ সম্পন্ন হবে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here