পৌষ সংক্রান্তি ও পৌষ পার্বণ আসলে লৌকিক উৎসব

0
19

যদি প্রশ্ন করা হয়, এমন কোনও তিথি কি আছে, যে সময়ে সমগ্র ভারতের উৎসবমুখর মুখচ্ছবিটি ধরা পড়েছে প্রাচীন কাল থেকে, অবিকৃত ভাবে? এর উত্তর হবে একটাই— আর তা হলাে পৌষের মাহেন্দ্রক্ষণ। পৌষ মাস বলতেই বাঙ্গালিরা এক কথায় পৌষপার্বণ আর পিঠপুলির কথা বলেন। কেউ কেউ আর একটু সংস্কৃত প্রবণ হয়ে বলেন মকর সংক্রান্তির কথা, চলতি কথায় পৌষ সংক্রান্তি। সংক্রান্তি অর্থাৎ শেষদিন— আসলে যা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে যাওয়ার কাল। পৌষ শেষের এই কালপর্বে ‘মকরস্নান’বা ‘মকর ডুব’য়ের পবিত্র আচারটি ধর্মপ্রাণ হিন্দুর সর্বাগ্রে মনে আসে। কিন্তু শুধু মকর সংক্রান্তির ডুব স্নান নয়, সমগ্র পৌষ মাস জুড়ে বঙ্গদেশে বহু ধর্মীয় সামাজিক আচার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথা বললে ভুল হবে, সারাদেশ জুড়েই এই সময়ের নানা ধর্মীয় সংস্কার ব্রতাচার পালিত হয়। এই সমস্ত আচার সংস্কারের শেকড় অত্যন্ত গভীর- একই সঙ্গে তা লৌকিক এবং শান্ট্রীয়; দেশীয় এবং আঞ্চলিক। অঞ্চল ও গােক্ঠীগত পার্থক্য থাকলেও, এদের মধ্যেকার মিলগুলিও খুব তাৎর্যপূর্ণ।

পৌষ পার্বণ কেন হয়

পৌষ মাসকে হিন্দু শাস্ত্রে অত্যন্ত পবিত্র গণ্য করা হয়। বলা হয়েছে, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রশস্ত এই মাস। ফলত, বিবাহ, গৃহনির্মাণ, সম্পদ সংগ্রহ ইত্যাদি ঐহিক ক্রিয়াকর্ম এই সময় অমঙ্গলকর। তাই নানান শুদ্ধ ধর্মাচার পালন করা এই সময়ে বিধেয়।

মকর সংক্রান্তি
মকর সংক্রান্তি

প্রশ্ন হলাে, এটি কি কেবল শাস্ত্রের বিধান; না কি বাস্তব নানা অনুষঙ্গ এমন একটি সময়ের জন্ম দিয়েছে? তা না হলে, এত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বর্ণ শ্রেণী নির্বিশেষে মানুষ কেন পৌষ পার্বণে এত উৎসবমুখর হয়ে উঠল।কেনই বা মহাভারতের যুগ ও পরবর্তী ইতিহাসকালে সম্রাট অশােকের প্রস্তর লিপিতে উল্লেখ অর্জন করল এই সময় আর তার উৎসব। এখানে একটি বিশেষ কথা খেয়াল রাখা দরকার। ভারতের চান্দ্রমাস নির্ভর পঞ্জিকায় একমাত্র ব্যতিক্রম এই মকর সংক্রান্তি, যা চলে সৌর পঞ্জিকার নিয়মে। সূর্য এই সময় দক্ষিণায়ন ত্যাগ করে উত্তরায়ণে গমন করেন। এই গমন ধনুরাশি থেকে মকর রাশিতে— যে কারণে এর নাম মকর সংক্রান্তি; আর সৌর মাস ধনু চান্দ্রমাস পৌষের সমসাময়িক। তাই পৌষ মাসে এই গমন বা সংক্রান্তি হয় বলে তা পৌষ সংক্রান্তি ।

এই সময়ে শীতকালীন অয়নান্ত বিন্দুটিকে অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে দিন ক্রমশ বাড়তে থাকে। অর্থাৎ সূর্ষের দাপট বাড়তে থাকে। বলা হয়, সূর্যের নবজন্ম হলাে এই দিন থেকে। মকর সংক্রান্তির মধ্যে সূর্যের এই গুরুত্বের দিকটি, অন্য ভাবে বললে সূর্য-উপাসনার প্রতীকী তাৎপর্যটি ধরা রয়েছে। আধুনিক বাঙ্গালি পঞ্জিকা মতে, বৈশাখ মাসে কিংবা ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে বছর শুরু হলেও, বাংলার লৌকিক পরম্পরায় মকর সংক্রান্তির দিনটিই বছরের শেষ দিন। পরদিন অথাৎ পয়লা মাঘ থেকে নতুন বছর শুরু, যে কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গে বনবাসী জনজাতিদের মধ্যে দিনটি আখান দিন নামে পরিচিত। সুতরাং বােঝাই যাচ্ছে, সূর্যের নবজন্ম, বছর শেষের সমস্ত গ্লানি পাপ ধুয়ে স্নানের মাধ্যমে শুদ্ধ পবিত্র হয়ে ওঠা কেবল মাত্র আচার সর্বস্ব নয়; কৃষিপ্রধান দেশে সূর্য- কেন্দ্রিক জীবনযাপনের এক সুপ্ত ইঙ্গিত লুকিয় আছ পূজা-পার্বণ-ব্রত আচারগুলির মধ্যে।

টুসু পুজা
টুসু পুজা

পৌষ সংক্রান্তি হল টুসু ও টুসু গান

সুর্যের অফুরন্ত দাক্ষিণ্য ছাড়া ফসলের প্রাচূর্য অকল্পনীয়। অঘ্রাণেই মূলত ফসল গােলায় উঠে যায়। পৌষ মাসে থাকে নিশ্চিন্ততা, শান্তি। যার আনুকুল্যে এই প্রাচূর্য লাভ, তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালােবাসা আর আনন্দের কথা জানান দিতে হবে না? বঙ্গদেশে শ্রেণী বর্ণ গােষ্ঠী ভেদ নানা ভাবে তাই এই কৃতজ্ঞতার উদযাপন হয়। হিন্দুর গৃহে গৃহে হয় পৌষ লক্ষ্মীর আরাধনা। বাড়িতে বাড়িতে পৌষ সংক্রান্তির দিনেসশীষ ধানের খড় দিয়ে আউনি-বাউনি বাঁধা হয়। সেই সঙ্গে টুসু গান ছড়া কাটা হয় :

আউনি বাউনি
তিন দিন কোথা যাওনি।
পিঠে ভাত খেও
এক কোটি আছে, বাহান্ন কোটি হােক।

একটি ঘটিতে চাল নিয়ে, তাতে কাঁচা টাকা রাখা হয় তার উপর পান সুপুরি দিয়ে আউনি-বাউনি শুদ্ধ গােলায় রাখা হয়। একে গােলা পুজাও বলে। গােলার সামনে, বাড়ির দুয়ারে, উঠানে আলপনা দেওয়া হয়। নতুন চাল পুরােনাে চাল মিশিয়ে রান্না করে খাওয়া হয়। এর পাশাপাশি নানা ধরনের পিঠে তৈরি করা হয়— তবে আবশ্যিক হলাে আসকে পিঠে। চালের গুড়িকে মাটির পাত্রে ভাপিয়ে তৈরি করা। সরলতম উপায়ে রান্না কৌশল। আরও নানা রকমের পিঠে হয়। পুলি পিঠে, পাটিসাপটা, দুধপুলি, সরুচাকলি, ভাজাপুলি।

এই পিঠে যেমন দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়, তেমনি পরিবার পরিজন বন্ধু বান্ধবের মধ্যেও আদান প্রদান হয়। কেবল তাই নয়, এই পিঠে দেওয়া হয় পশুপক্ষীকে, জলে এবং আগুনে। লােক বিশ্বাস এই যে, এই সময় পিঠে না খেলে ‘পােষ বিড়ালি’ হতে হয়। পৌষ সংক্রান্তির দিন নদী বা পুকুর ঘাটে গিয়ে ডুব স্নান করাও একটি আবশ্যিক আচার। স্নানের আগে মাথায় সরষে ফুল মুলাে ফুল রাখার একটি সংস্কারও কোথাও কোথাও দেখা যায়। স্নান করে উঠে মেয়েরা ‘মকর পাতাতাে’—মকর পাতানাে অর্থাৎ ফুল সই পাতানাে। যেখানে দুই বন্ধু কোনও একটি ফুল নিজেদের মধ্যে বিনিময় করতাে—-চাঁপা বা গােলাপ ইত্যাদি ফুলের নামেই সেই থকে তারা পরস্পরকে ডাকতাে।

মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে স্নান
মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে স্নান

এই মকর পরবেই পালিত হয় দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের এক অতি জনপ্রিয় উৎসব টুসু। এই অঞ্চলের বনবাসী থেকে জাতিবর্ণের মানুষের অত্যন্ত প্রিয় উৎসব এই টুসু। কর্মিমাহাতা, বাউরি, বাগদি, ভূমিজ, বাগান বৈগা প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়ই এই টুসু পরব পালন করে থাকেন। সমগ্র পৌষ মাস জুড়েই টুসু উপলক্ষ্যে নাচ গান করা। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিনকে বলে ‘বাঁউনি’ (কোথাও বাউরী); এদিন হাট থেকে টুস মূর্তি বা চৌদশা কিনে আনা হয়। এদিন সারারাত বাড়ির ও পাড়ার মেয়েরা নাচ-গান করেন। রাতভর এই গান গাওয়াকে বলে ‘জাগরণ’। টুসু মূর্তি বলতে নানা রকম দেখা যায়। কোথাও দ্বিভুজা লক্ষ্মীর মতাে; কোথাও পুতুলের মতাে, আবার দুটি গােবরের ছােটো ডেলাও টুসুর প্রতীক। মুলত পুরুলিয়া, সংলগ্ন পশ্চিম মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম জুড়ে এই উৎসব পালিত হয়। ইদানীং হূগলী, নদীয়া প্রভৃতি অঞ্চলে, যেখানে বনবাসী মানুষেরা পশ্চিম থেকে অভিবাসিত হয়ে এসেছেন, সেখানেও টুসু পর্ব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পৌষ পার্বণ উপলক্ষ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিরাট সমারােহ দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। যাই হােক, পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন, বাড়ির ধান রাখা হয় যেখানে, সেখানে টুসুর পুজো হয়। বাড়ির মেয়েরাই এই পুজো করে। চিড়া, গুড়, ছােলা, মুগ, নারকেল, বাদাম, কুল, ফল, মিষ্টি দিয়ে পুজো নিবেদন করা হয়। এর পর বাড়ির মেয়েরা টুসু গান করেন। গানে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কথা, ভালােবাসা, দুঃখ, বেদনার কথা, সমসাময়িক ঘটনা সমস্ত কিছুই উঠ আসে। মৌখিক এই সৃষ্টি, প্রজ্ম পরম্পরায় বাহিত হয়ে চলেছে। গানের মধ্যে আসেন শ্রীকৃষ্ণ, রামসীতা, হনুমান। ‘বৃহৎ’ আর “ক্ষুদ্র ঐতিহ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আবহমানের ভারতবর্ষের ছবি উঠে আসে। টুসুকে বন্দনা করে টুসু গান হয় :

শখের ঘাটি শখের বাটি
শখে দিব আলপনা,
দেখ টুসু তাের শখ রেখেছে
মেড়-এ রুপাের কারখানা।

এই টুসু কখনও বাড়ির মেয়ে, কখনও প্রেয়সী কিংবা বন্ধু। আবার টুসু রক্ষয়িত্রী, শস্যের দেবী, ধনান্যের দেবী। সংক্রান্তির দিন টুসুর ভাসান বা বিসর্জন হয় স্থানীয় নদী বা বাঁধের জলে। শােভাযাত্রা করে, কাঁধে বা মাথায় করে দেবীকে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরুলিয়ায় চৌদশা সাজানাে হয়। এই উপলক্ষ্য বিরাট মেলাও বসে। এখানেও গান-নাচ হয়। মকর সংক্রান্তির দিন এই অঞ্চলগুলিতে স্নান করে তিলকট বা তিল মিঠা খাওয়ার একটি প্রথা রয়েছে। সেই সঙ্গে অবশ্যই নানা রকমের পিঠা তৈরি করা হয়—পুর পিঠা, আসকে পিঠা, গােলা পিঠা, চারপা পিঠা, ছাকা পিঠা ইত্যাদি। এক বৃদ্ধ তার স্মৃতিচারণায় বলেন, আগে মকরেই নতুন জামাকাপড় হতাে। দুর্গা পুজোয় নয়। মকর ডুব দিয়ে নতুন জামা পরে ‘তিলমিঠা’ খাওয়া হতাে।

পৌষ পার্বণে লক্ষ্মীপুজা

হিমমাখা কচি ঘাসের পথ ধরেই এই বঙ্গে আবির্ভাব ঘটে হেমন্ত লক্ষ্মীর। পৌষ লক্ষ্মী নামেও পূজিতা তিনি বাংলার ঘরে ঘরে। তাঁর দিব্য প্রসাদে বিস্তীর্ণ মাঠ ভরে ওঠে সােনালি ফসলের ভারে ভারে। সমৃদ্ধির আনন্দরেখা ফুটে ওঠে গণ-আননে। সকল শ্রেণীর মানুষের মনই হিন্দোলিত হয় নব নব আনন্দ রাগে। মানসিক সেই প্রশান্তিই দেবী বন্দনায় ঝরে পড়ে ভক্তি অর্ঘ্যরূপে। ঘরে ঘরে নবপ্রাশনের সঙ্গেই হয় পৌষলক্ষ্মীর আরাধনা।

পৌষ লক্ষ্মী পুজা
পৌষ লক্ষ্মী পুজা

বাংলা বছরের নবম মাস পৌষ। অন্য নাম যার সৌভাগ্য মাস। নতুন ওঠা শস্য আর প্রকৃতির রূপ-রূপান্তর সকলকেই করে তােলে আনন্দমুখর। পত্রে-পুষ্পে, জীবজগতেও দেখা যায় বিচিত্র সব রং-ভাবনা। সকলেই সুখ বিহুল। আবেগ-ঘন হৃদয় সুখ ও আন্দের মূলীভূত শক্তি দেবীর প্রতি অন্তর-উজাড় করা কৃতজ্ঞতা জানাতেই মেতে ওঠে দেবী লক্ষ্মীর বিশেষ পূজার্চনার।

পৌষলক্ষ্মী অভয়দায়িনী। সম্পদ প্রদায়িনী। তাই তিনি পৌষের এই হেমন্ত-বেলায় ধনলক্ষ্মী-ধান লক্ষ্মী ।ধানই ধন। তাই ধান্যলক্ষ্মীরূপেই আরাধিতা।

লক্ষ্মীই নারায়ণী। শ্রী ও সমৃদ্ধির প্রতীক। গৃহস্থের ঘরে ঘরে প্রতি বৃহস্পতিবারে তিনি হন অর্চিতা। সারা বছর ধরেই চলে তাঁর উপাসনা। কোজাগরী বা দীপান্বিতায় যেমন হয় দেবীপূজা, তেমনই পৌষ, চৈত্রে বা ভাদ্রে হয় লক্ষ্মীর বিশেষ পুজা। অঞ্চল ভেদে এক এক মাসে এক এক নামে হয় এই লক্ষ্মী পূজা।

আশ্বিন-কার্তিকে কোজাগরী ও দীপান্বিতার লক্ষ্মী পুজার পরই বিশেষ করে কৃষি-নির্ভর পল্লিবাংলার ঘরে হয় কৃষি বা ভূমিলক্ষ্মীর এই আরাধনা। পৌষলক্ষ্মীর এই পুজা হয় কখনও সরায় আঁকা পট বা লক্ষ্মী-সরায়। কখনও বা হয় ধানের পাত্রে। নতুন ফসলের অন্ন দিয়ে বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গেই পূজা হয় দেবীর।

সাধারণ লক্ষ্মীপুজার মতােই পৌষলক্ষ্মীর পুজারও মূল আয়ােজন করেন ঘরের মহিলারাই। পুজার জন্য কখনও ডাকা হয় পুরােহিতকে, কখনও বা বাড়ির বউরাই সাঙ্গ করেন সেসব কাজ। পল্লিবাংলায় বিগত অতীতেও তখন বাড়ির অঙ্গন নিকোনাে হতাে গােবর-জলে। ধানের মড়াইতে দেওয়া হতাে শ্রী-চিহ্ন। পিটুলি দিয়ে দেওয়া হতাে আলপনা সর্বত্র। গােয়াল ঘরও পরিস্কার করা হতাে ভালাে ভাবে। গােরুর শিং ও পায়ে মাখানাে হতাে এল চর্চিত হতাে তা সিঁদুরে। বস্তুত লক্ষ্মীপুজার সঙ্গেই এদিন পূজা কর তা গাে-ধন এবং চাষের জন্য প্রয়ােজনীয় লাঙল-কোদাল ইত্যাদিও

পৌষ পূর্ণিমায় আয়ােজিত এই লক্ষ্মী পূজায় দেওয়া হয় নানা মরশুমি ফল। দেবীকে দেন পিঠে পায়েস ও অন্নভােগও। দিনটি বিশেষ করে গ্রামবাংলার জীবনে এক বিশেষ আনন্দ-উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে। অনেকে এই দিনে নতুন পােশাকও পরে থাকেন।

বছরের বিভিন্ন মাসে বিশেষ ভাবে পুজিতা দেবী লক্ষ্মীর অর্চনার অন্যতম অঙ্গ পাঁচালি পাঠ। বাড়ির মহিলারাই পাঠ করেন পাঁচালি। কোথাও কোথাও অবশ্য পুরােহিতই শােনান তা। ধারণা, এই ভাবে পঁচালি শ্রবণের মধ্য দিয়েই পাওয়া যায় ব্রতফল। এই প্রসঙ্গেই বছরের বিশেষ বিশেষ পূর্ণিমা তিথিতে দেবী লক্ষ্মীর এই আরাধনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে এক একটি কাহিনি। পৌষ-লক্ষ্মীর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটে না তার।

পৌষ-লক্ষ্মীর ব্রতকথাটি বড়ােই তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে দেবীর মহিমা এবং ব্যক্তিজীবনের নানা বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক কারণেই অনেক সময় অত্যন্ত আপনজনও পর হয়ে যান— ব্যবহার করেন অ-মানবের মতাে। তারই বাস্তব আলেখ্য যেন এই ব্রত কথা। আবার সৎ ও সুন্দরের নীতিতে অবিচলিত থেকে, ভক্তি ও বিশ্বাসে একনিষ্ঠ থেকে দেবীপুজা করলে কীভাবে তার কুপা পাওয়া যায়, তারও ভক্তিনিষ্ঠ চিত্রায়ণ যেন এই ব্রতকথা। এই ব্রতকথার অপর বৈশিষ্ট্য এর মধ্য দিয়ে ঘােষিত হয়েছে একটি নীতি আদর্শের কথা। বলা হয়েছে, মানুষের সম্পর্কটা হলাে আন্তরিক, ধন-সম্পদের নিরিখে সম্পর্ক গড়লে তাকে ঠকতেই হয়। দন্ধ হতে হয় অনুশােচনায়। অবশ্য তারই মধ্য দিয়ে ঘটে হাদয়ের পরিবর্তন। সম্পর্কের ক্ষত্রে ধনরত্ন নয় মর্যাদা দেওয়া উচিত মানবতাকেই। পাঁচালির প্রচলিত পথ ধরেই পৌষলক্ষ্মীর কথা-কাহিনি গড়ে উঠেছে।

পৌষ পার্বণের পিঠে ও বিভিন্ন খাবার

কৃষিপ্রধান বঙ্গদেশে ধান মুখ্য ফসল তাই নতুন চাল পৌষ পার্বণের মুখ্য উপাদান। আমাদের দেশের সব প্রান্তে পৌষ সংক্রান্তির দিন ভােরবেলা স্নান করে নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে পূজা করে, নতুন চালের বিভিন্ন ব্যঞ্জন রান্না করে, ভগবানকে নিবেদন করার পর তার প্রসাদ পাওয়ার রীতি অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। কোথাও খিচুড়ি, কোথাও পায়েস, কোথাও বা আরও অনেকরকম নতুন চালের পদ। প্রকৃতির দান নতুন চালই হলাে এই পার্বণের পূজ্য।

পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটিতে বিভিন্ন রকমের মিষ্ঠান্ন, পিঠেপুলি বানানা হয়ে থাকে। ঘরে ঘরে নতুন চাল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার পদ তৈরি করা হয়। নানান রকমের পদ হলেও এর জন্য প্রয়ােজন কিছু ঘরােয়া জিনিস যেমন—নতুন চাল, নতুন চালের গুঁড়াে, নারকেল, নতুন খেজুর গুড়, দুধ, চিনি, সামান্য ময়দা, জল। বর্তমানে টেলিভিশনের পর্দায় রান্নার যেসব ‘শাে’ প্রদর্শিত হয়, তার সঙ্গে এইসব পরম্পরাগত রান্নার উপাদান, পদ্ধতি, স্বাদ, স্বাস্থ্য ও অর্থব্য় কানোটাই তুলনা করা যায় না। এক কথায় অতুলনীয় এই ঘরােয়া পদগুলি। সব বয়সেই মানুষেরাই পছন্দ করেন পিঠে-পুলি-পায়েস। অনেকরকমের কিছু হলাে— আসকে পিঠে বা সরা পিঠে, পুলি পিঠে, দুধ-পুলি, পাটিসাপটা, নতুন চালের পায়েস, চোহি বা চুষির পায়েস ইত্যাদি। এছাড়া নতুন ফসল রাঙা আলুর বড়াও বানানাে হয়ে থাকে এই সময়।

পৌষ পার্বণের পিঠে পুলি
পৌষ পার্বণের পিঠে পুলি

নিচে কয়েক প্রকার প্রচলিত পিঠে ও তাদের তৈরির কৌশল আলচনা করলাম।

আস্কে পিঠে

পৌষ পার্বণের প্রথম দিন হয় আস্কে পিঠে বা সিদ্ধ পিঠে। নতুন চাল ভিজিয়ে দিতে হবে। ভিজে গেলে জল ঝরিয়ে শিলে পিষে নিন। দশকর্মার দোকানে ছাচ পাওয়া যায়, এনে ধুয়ে রাখুন। নতুন খেজুর গুড় (পয়রা শুড়) নিয়ে আসুন, নারকেল কুরে রাখুন।

এবারে হাঁড়িতে জল বসান। ফুটে উঠলে ছাঁটা হাঁড়ির মুখে রাখুন। তার ওপরে যে চালটা গুঁড়া করে রেখেছেন, সামান্য জল দিয়ে মাখুন, গােল করে ছাঁচের ওপর দিন। জলের ভাপে সেদ্ধ হবে। কোরা নারকেল আর পাতলা গুড় দিয়ে খান, তােফা!। নােনতা পিঠে ঠিক এভাবেই হবে তবে একটু তরকারির পুর, ফুলকপি বা বাঁধাকপি একটু বড়াে করে পুলি করে তার মধ্যে ভরে দিন, ছাঁচে দিন। ধনেপাতার চাটনি দিয়ে খান।

মালপােয়া

দুধের মধ্যে চিনি, সুজি, ময়দা, সামান্য মৌরি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন।

কড়ায় সাদা তেল গরম হয়ে গেলে হাতায় করে দিন, এক পিঠ হয়ে গেলে উলটে দিন। খুব সহজে একটা স্বাদের খাবার। খুব পাকা কলা কালাে হয়ে। গেলে কেউ খাবে না। ময়দার সঙ্গে কলা চটকে নিন। চিনি দিয়ে মেখে দুধ দিন। এবার ভেজে ফেলুন। দেখুন কী স্বাদ।

পাটিসাপটা

মিষ্টি পিঠে পুলির প্রথমেই যার নাম আসে তা ‘পাটিসাপটা’। তাওয়ায় করা যায় তবে ফ্রাইং প্যানে সুবিধে হয়। ময়দা নিন দুকাপ, দুচামচ সুজি জল দিয়ে গুলে নিন। নারকেল কুরে পাক কর নিন, গুড় বা চিনি দিয়ে। নাড়ুর পাক হবে। এবার প্যান ওভেনে চড়ান। গরম হলে হাতায় করে ঢেলে দিন। আঁচ কম থাকবে। একটা দিক হয়ে এলে খানিকটা নারকেলের পুর নিয়ে ওটির মাবখানে লম্বা করে দিন। এবার খুস্তি দিয়ে পাশ থেকে মুড়ে মাথা আর তলাটা একটু চেপে দিন। আস্তে আস্তে মুড়ে মাদুরের মতাে রােল করে দিন। এবার খুন্তি দিয়ে আস্তে করে নামিয়ে সাজিয়ে রাখুন পর পর। আবার এই জিনিসই ক্ষীর দিয়ে করতে পারেন। কিশমিশ দিন, ক্ষীরটা চিনি দিয়ে নেড়ে নিন।

মুগের ভাজা পুলি

মুগের ডাল ভেজে সেদ্ধ করে নিন। একটুও জল থাকবে না। এর মধ্যে অল্প ময়দা ও সুজি দিয়ে মেখে লেচি করুন। বাটির মতাে করে ভেতরে নারকেলের পুর দিতে হবে। এবারও নারকেল গুড় দিয়ে নাডুর পাক দিয়ে নেবেন। পুলির মতাে গড়ে নিন, ভাজুন, গরম গরম খান। একটা কথা, যাই করুন ধৈর্য নিয়ে করুন।

ক্ষীরের মােমাে

মােমাে তাে আমিষ, নিরামিষ অনেক রকমই হয়। পিঠের সময় তাে, আমি ক্ষীরের মােমাে বানাব। ক্ষীর, চিনি, কিশমিশ, কাজু একসঙ্গে মাখুন যেন শুকনাে থাকে, এবার ময়দা অল্প ময়ান দিয়ে মেখে লেচি করুন। লুচির মতাে বেলুন, মাঝখানে ক্ষীর গােল করে দিন। এবার লেচির চারদিক থকে নিয়ে মাথার কাছে জড়াে করুন, পুটলির মতাে মাথার কাছটা একটু পাকিয়ে দিন, এবার ভেজে রাখুন।

গােবিন্দভােগ চালের পায়েস

গােবিন্দ ভােগ চাল ঘিয়ে ভেজে নিন। নামিয়ে নিন, দুধ ফুটতে দিন, দুধটা বেশ ঘন হবে। ঘিয়ে ভাজা চাল দুধে ছেডে দিন। চাল সেদ্ধ হয়ে ঘন হবে। চিনি ড্রাইফ়ুট, এলাচ গুঁড়াে দিন। ভাজা সেসবই দুধে দিন, দু’ফুট হলে নামিয়ে দিন। দেখুন তাে কী পরিতৃপ্তির সঙ্গে সবাই খাচ্ছে, পূর্ণতার উৎসব তাে।

দুধ পুলি

চালের গুঁড়ির সঙ্গে অল্প সুজি দিয়ে মেখে লেচি করুন। বাটির মতাে করে তাঁর মধ্যে নারকেলের পুর দিয়ে পুলি করুন। এবার দুধ ঘন করতে দিন। দুধ ঘন হলে কয়েকটি পিঠে দিন। বেশ কিছুক্ষণ ফুটলে সেদ্ধ হয়ে যাবে এবার নতুন গুড় দিন। বেশ ঘন থাকতে নামান। এটি খবই উপাদেয়।

রাঙা আলুর পুলি

বড়াে কড়ায় জল চাপান। এতে রাঙা আলুগুলাে দিন। একটু পরে দেখুন সেদ্ধ হয়েছে কিনা। বেশি সেদ্ধ করা যাবে না। নখ ফুটিয়ে দেখে একটুকরাে হাত দিয়ে স্ম্যাস করুন। যদি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সবগুলাে নামিয়ে নিন। একটা একটা করে খুব ভালাে করে মাখুন এবার ওতে সামান্য ময়দা দিন। একটু ডিমের মতাে আকারে তৈরি করুন। তারপর তেলে লাল করে ভেজে ঘন রসের মধ্যে ফেলুন।

ছােলার ডালের বরফি

আড়াইশাে গ্রাম ছােলার ডাল প্রেসার কুকারে সেদ্ধ করুন। সেদ্ধ হলে মিক্সিতে মিহি করে পিসে নিন। কড়ায় ঘি বা সাদা তেল দিন। তেল গরম হলে ওতে মাখাটা ঢেলে দিন, কম আগুনে আস্তে আস্তে নাড়তে থাকুন। নাড়তে-নাড়তে মােটামুটি ভাজা ভাজা হলে ওতে ক্ষীর, চিনি, ড্রাইফ্রুট, ছাটো এলাচের গুঁড়াে দিয়ে এমন ভাবে নাড়ুন যাতে সবটা বেশ মিশে যায়। যখন দেখবেন কড়া থেকে উঠে আসছে। তখন একটা স্টিলের বড়াে থালায় তেল মাখিয়ে ঢেলে দিয়ে হাত দিয়ে চেপে চেপে দিন। এবার খুন্তি দিয়ে বরফির মতাে করে কেটে দিন। ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হলে পরিবেশন করুন।

কড়াইশুটির চপ

কড়াইশুটির দানাগুলি অল্প ভাপিয়ে মিক্সিতে পিসে নিন। তাতে সেদ্ধ আলু, লঙ্কাগুড়াে, ভাজা ধনে গুঁড়াে, আদা, রসুন বাটা, গরম মশলার গুঁড়াে নুন ও কর্নফ্লাওয়ার দিয়ে ভালাে করে মেখে ছােটো ছােটো বলের আকারে তৈরি করে নিতে হবে। এবার বলগুলাে ডিমের গােলায় ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে রােল করে তেলে ভেজে নিন। এবং গরম গরম পরিবেশন করুন।

পটলের মিষ্টি

তাজা পটলের ওপরের খােসা ছুরি দিয়ে হালকা হাতে চেঁছে ফেলুন। এবার পটলের মাবাখানটা ছুরি দিয়ে সাবধানে চিরুন। ভেতরের বীজগুলি ফেলে দিন। ক্ষীর কিসমিস মাখা আস্তে আস্তে ভরে দিন। কড়ায় তেল গরম হয়ে গেলে একটু ঠাণ্ডা করে দু’ একটা করে পটল দিন যেন ভাজা হয়ে না যায়। চওড়া বাসনে রস রাখুন। রস গরম থাকতে পটলগুলাে ওর মধ্যে থাকবে। পরে তুলে রাখবেন।

চালের পায়েস

১০০ গ্রাম গােবিন্দভােগ চালে চারপ্যাকেট দুধ লাগবে। ভালাে করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। কড়াইতে সামান্য ঘি দিয়ে চালটা সামান্য ভেজে নিন। সব দুধটা ফোটান, চালটা এই সময় দিয়ে দিন। দুধ ঘন হবে, চালও সেদ্ধ হবে। চাল সেদ্ধ হলে বাতাসা, চিনি, ড্রাই ফ্রুট দিন। নামাবার আগে নতুন পাটালি গুড় দিন। দেখুন সারা বাড়ি গন্ধে ম-ম করছে। শীতে এই পায়েস হলাে মহাভােগ।

যাইহোক, মকর স্নান, লক্ষ্মী পুজো বা টুসুই নয়; পৌষে সাঁওতালদের মধ্যে সাকরাত পরব অনুষ্ঠিত হয়। বাইগা-বাগলিরা টুসু ছাড়াও পৌষেই করেন পাহাড় পুজো। বস্তুত পৌষজুড়ে পৌষ পার্বণে এভাবেই শাস্ত্রীয় ও লোকাচার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here