সংকর ধাতু বা ধাতু সংকর – প্রস্তুতি, বৈশিষ্ট্য, উপযোগিতা, গুরুত্ব

0
164

সংকর ধাতু কাকে বলে

দুই বা ততোধিক ধাতুর সাধারণ মিশ্রনের ফলে উৎপন্ন সমসত্ব ও অসমসত্ব কঠিন পদার্থকে সংকর ধাতু বলে। যেমন তামা ও দস্তা সংমিশ্রণের ফলে উৎপন্ন পিতল একটি সংকর ধাতুর উদাহরণ। উল্লেখ্য যে, শংকর ধাতুতে এক বা একাধিক অধাতু মিশ্রিত থাকতে পারে। যেমন ইস্পাত লোহা ও কার্বনের মিশ্রণে তৈরি সংকর ধাতু।

সংকর ধাতু প্রস্তুতি

বিভিন্নভাবে সংকর ধাতু তৈরি করা হয়
১. তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতি
দুটি আলাদা ধাতুর লবণের মিশ্রিত দ্রবণের মধ্যে তড়িৎ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, দুটি ধাতু ক্যাথোডে একইসঙ্গে সঞ্চিত হয়ে ধাতু সংকর উৎপন্ন করে। তামা এবং দস্তার লবণ থেকেই এইভাবে তড়িৎ বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে পিতল উৎপন্ন করা হয়।
২. বিগলন পদ্ধতি
দুই বা ততোধিক ধাতু নির্দিষ্ট পরিমাণে একইসঙ্গে গলিয়ে কিংবা দুই বা ততোধিক ধাতুকে পৃথক-পৃথক পাত্রে গলিয়ে, গলিত ধাতু গুলি পরিমাণ মতো মিশিয়ে সংকর ধাতু তৈরি করা হয়। যেমন দুই ভাগ জিংক এবং সাত ভাগ কপার ধাতুর পরিমাণ মতো নিয়ে একসঙ্গে গলিয়ে ঠান্ডা করলে পিতল নামে সংকর ধাতু উৎপন্ন হয়। অনুরূপভাবে কপার ও তিন ধাতুর মিশ্রণে কাসা প্রস্তুত করা হয়।
৩. যান্ত্রিক পদ্ধতি
দুই বা ততোধিক ধাতু গুঁড়ো করে একসঙ্গে মিশিয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংকর ধাতু উৎপন্ন করা হয়। যেমন পরিমাণগত ক্যাডমিয়াম, বিসমাথ চূর্ণ, সিসা ও টিন চূর্ণ একসঙ্গে পিটিয়ে মিশিয়ে উডমেটাল নামে ধাতু সংকর তৈরি করা হয়।
৪. কখনো কখনো বিভিন্ন ধাতুর অক্সাইড গুলোকে পরিমাণ মতো মিশিয়ে, বিভিন্ন অক্সাইডের ওই মিশ্রণকে কার্বন দিয়ে বিজারিত করে কার্বন বিজারণ পদ্ধতিতে ধাতু সংকর তৈরি করা হয়।

সংকর ধাতুর উপযোগিতা বা গুরুত্ব

একই রকম সংকর ধাতু, একক ধাতু থেকে অনেক সময় বিভিন্ন গুণসম্পন্ন হয়। যেমন কপার ও টিনের মিশ্রণে কাসা উৎপন্ন হয়। এতে করে তামার ক্ষয় অনেক কমে যায়। আর তাই, খাদ্যদ্রব্য এতে রাখলে তামা দ্রবীভূত হয় না, ফলে তামার বিক্রিয়া হয় না।
১. ধাতুর কাঠিন্য বাড়াবার কাজে সংকর ধাতু ভূমিকা পালন করে।
২. তাপ ও বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বা কমানোর জন্য
৩. নমনীয়তা, সম্প্রসারণশীলতা, ঘাত সহনশীলতা, ঘনত্ব ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।
৪. জল প্রভৃতির ক্রিয়া দ্বারা ক্ষয় নিবারণের জন্য
৫. জারণ ক্রিয়া কমানোর জন্য সংকর ধাতু ব্যবহার করা হয়।

সংকর ধাতুর বৈশিষ্ট্য

নিচে সংকর ধাতুর বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো
১. ধাতু শংকর হলো দুই বা ততোধিক ধাতুর একটি সাধারণ মিশ্রণ।
২. ধাতু শংকরের মিশ্রণটি সমসত্ব ও অসমসত্ব এই দুই রকমের হতে পারে।
৩. কোন কোন সময় এক বা একাধিক ধাতুর সঙ্গে কার্বন, সিলিকন, ফসফরাস প্রভৃতি অধাতু যুক্ত হয়েও ধাতুসংকর তৈরি হয়।
৪. ধাতু শংকর তার উপাদান ধাতু গুলোর থেকে বেশ কয়েকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়।
৫. সংকর ধাতু গুলির কাঠিন্য তার উপাদান মৌলগুলোর কাঠিন্য থেকে বেশি হয়।যেমন তামা নরম ধাতু হলেও তামা ও টিনের সংমিশ্রণে উৎপন্ন ধাতুসংকর কাঁসা তামার তুলনায় অনেক বেশী শক্ত।
৬. সাধারণ ধাতুর তুলনায় সংকর ধাতু অনেক বেশি নমনীয়, ঘাতসহ এবং প্রসারণশীল।
৭. পারদ সংকর
কোন সংকর ধাতুর একটি উপাদান যদি পারদ হয়, তবে সেই ধাতু সংকরটিকে অ্যামালগাম বা পারদ সংকর বলা হয়। বিভিন্ন পারদ সংকরকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন রুপোর পারদ সংকর দাঁতের চিকিৎসায়, টিনের পারদ সংকর আয়না তৈরীর জন্য কিংবা দস্তার পারদ সংকর বৈদ্যুতিক ব্যাটারীতে ব্যবহার করা হয়।

সংকর ধাতু সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

সংকর ধাতু তৈরি করা হয় কেন

বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় যে, সব সংকর ধাতু তার উপাদান ধাতুগুলোর তুলনায় বেশ কয়েকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়।, যেমন
১. সংকর ধাতুর কাঠিন্য উপাদান মৌলের প্রত্যেকটির কাঠিন্য থেকে বেশি হয়। লোহার ধাতুসংকর অ্যালনিকো নিজের ওজনের চেয়ে চার হাজার গুণ ভার বহন করতে পারে। আবার তামা বা কপার নরম ধাতু হলেও তামা ও টিনের ধাতু শংকর কাঁসা তামার তুলনায় অনেক শক্ত।
২. সংকর ধাতুর গলনাংক উপাদান মৌলের গলনাঙ্ক থেকে কম হয়।
৩. শংকর ধাতুতে উপাদান মৌলগুলির রাসায়নিক স্বক্রিয়তা ও জারণ ক্রিয়া কমে। ফলে জলবায়ুতে কম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
৪. তাপ ও বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বাড়ানো কমানোর জন্য সংকর ধাতু ব্যবহার করা হয়।
৫. সাধারণ ধাতুর তুলনায় সংকর ধাতু বেশি নমনীয় ঘাতসহ প্রসার্য হওয়ায় ধাতুর পরিবর্তে সংকর ধাতুর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিধাতব পাত কি এবং কিভাবে কাজ করে

একই মাপের দুটি আলাদা ধাতুর পাত নিয়ে একটিকে অন্যটির উপর রেখে রিভেট করে আটকে নিলে ধাতুপাতের যে জোড় তৈরি হয়, তাকে দ্বিধাতব পাত বলে। দ্বিধাতব পাতকে গরম করলে পাতটি যে দিকে বেঁকে যায়, ঠান্ডা করলে ঠিক তার বিপরীত দিকে বেঁকে যায়। ফায়ার এলার্ম, ইনকিউবেটর, রেফ্রিজারেটর, জল গরম করার যন্ত্রপাতি প্রভৃতিতে দ্বিধাতব পাত ব্যবহার করা হয়।

ডুরালুমিন এর উপাদান ও ব্যবহার

ডুরালুমিন অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়া্‌ কপার এবং ম্যাঙ্গানিজ দিয়ে গঠিত ধাতু সংকর। ডুরালুমিনের উপাদান এর মধ্যে 95% অ্যালুমিনিয়াম, 0.5% ম্যাঙ্গানিজ, 0.5% ম্যাগনেসিয়াম, কপার 4% কপার বর্তমান থাকে।
ডুরালুমিনের ব্যবহার
ডুরালুমিন বিমান ও মোটর গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং অংশ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়।

ম্যাগনেলিয়াম কি দিয়ে তৈরি এবং ম্যাগনেসিয়ামের ব্যবহার

ম্যাগনেলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম দিয়ে তৈরি সংকর ধাতু। ম্যাগন্য়ালিমের মধ্যে 98% অ্যালুমিনিয়াম এবং 2% ম্যাগনেসিয়াম বর্তমান থাকে।
ম্যাগনেলিয়ামের ব্যবহার
তুলাদন্ড, যানবাহনের কাঠামো এবং যন্ত্রপাতি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়

স্টেইনলেস স্টিলের উপাদান এবং স্টেনলেস স্টিলের ব্যবহার

স্টেনলেস স্টিল, লোহা এবং ক্রোমিয়াম দিয়ে তৈরি ধাতু শংকর। স্টেনলেস স্টিলের মধ্যে 85-90%, লোহা এবং 10-15% ক্রোমিয়াম থাকে।
স্টেনলেস স্টিলের ব্যবহার
কোন ধাতুর মরিচা পড়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য স্টেনলেস স্টিল তৈরি করা হয়ে থাকে। রুপোর মত চকচকে এই ধাতুসংকর বাসনপত্র, ছুরি-কাঁচি প্রভৃতি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।

ডেল্টা মেটাল কি দিয়ে তৈরি এবং ডেল্টা মেটালের ব্যবহার

ডেল্টা মেটাল, কপার, লোহা, জিংক এবং ম্যাঙ্গানিজ দিয়ে তৈরি ধাতু সংকর। ডেল্টা মেটালের মধ্যে 55% কপার, 40% জিংক এবং 5% লোহা বা ম্যাঙ্গানিজ থাকে।
ডেল্টা মেটালের ব্যবহার
বিয়ারিং, ভাল্ব, জাহাজের প্রোপেলার প্রকৃতি প্রস্তুত করতে ব্যবহার করা হয়।

ইলেকট্রন কি দিয়ে তৈরি এবং কি কাজে ব্যবহার হয়

ইলেকট্রন একটি সংকর ধাতু। ইলেকট্রনের মধ্যে ম্যাগনেসিয়াম এবং জিংক থাকে। 5% জিংক এবং 95% ম্যাগনেসিয়াম দিয়ে ইলেক্ট্রন তৈরি হয়।
ইলেকট্রনের ব্যবহার
বিমান এবং মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়।

গান মেটাল কি দিয়ে তৈরি এবং এর ব্যবহার

গান মেটাল কপার, জিংক এবং স্ট্যানাম দিয়ে তৈরি ধাতু সংকর। গান মেটাল এর মধ্যে 85% কপার, 10% জিংক এবং 5% স্ট্যানাম বর্তমান।
গান মেটাল এর ব্যবহার
বন্দুক এবং সামরিক যন্ত্র প্রস্তুতিতে গান মেটাল ব্যবহার করা হয়।

নাইক্রোম কি এবং এর ব্যবহার

নিয়ন, ক্রোমিয়াম এবং লোহার সংমিশ্রণে তৈরি নাইক্রোম একটি ধাতু শংকর। নাইক্রোম এর মধ্যে 60% নিয়ন 15% ক্রোমিয়াম এবং 25% লোহা বর্তমান থাকে।
নাইক্রোম এর ব্যবহার
বৈদ্যুতিক হিটার, বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি প্রভৃতি তৈরিতে নাইক্রোম ব্যবহার করা হয়।

অ্যালনিকো কি এবং এর ব্যবহার

্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, নিকেল এবং কোবাল্ট এর সমন্বয়ে তৈরি অ্যালনিকো একটি ধাতু সংকর। অ্যালনিকোর মধ্যে 50% ইসটিল 20% অ্যালুমিনিয়াম 20% নিকেল এবং 10% কপাল বর্তমান থাকে।
অ্যালনিকোর ব্যবহার
অ্যালনিকো স্থায়ী চুম্বক প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়।

রাংঝাল কি ধাতু বা কাকে বলে? রাংঝালের ব্যবহার

লেড এবং স্টানাম দিয়ে রাংঝাল তৈরি হয়। রাংঝাল একটি ধাতু সংকর। রাংঝালের মধ্যে 50% লেড এবং 50% স্টানাম থাকে।
রাংঝালের ব্যবহার
ঝালাইয়ের কাজে রাংঝাল ব্যবহার করা হয়।

ইনভার কি ? ইনভারের উপাদান ও ব্যবহার

ইনভার একটি ধাতু সংকর। ইনভার লোহা এবং নিকেল দিয়ে তৈরি হয়। ইনভারের মধ্যে 2-4% নিকেল এবং 96-98% লোহা থাকে।
ইনভারের ব্যবহার
পরিমাপের যন্ত্র প্রস্তুতিতে ইনভার ব্যবহার করা হয়

আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here