চলন ও গমন কি বা কাকে বলে | চলন ও গমনের ৭টি পার্থক্য ও উদ্দেশ্য| চলন কত প্রকার ও কি কি

0
285

এই আলোচনা পর্বে আমরা চলন ও গমন সম্বন্ধে সম্যক ধারণা স্পষ্ট করব। সজীব বস্তুর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে চলন ও গমন একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কারণ উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া জীবের একটি প্রধান ধর্ম। উদ্দেশ্য এক হলেও চলন ও গমন একই নয়, যদিও মূলত প্রোটোপ্লাজম এর দ্বারাই চলন গমন নিষ্পন্ন হয়। জল বায়ু আলো তার স্পর্শ প্রভৃতি বাহ্যিক এবং ক্ষুধা তৃষ্ণা ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকে সারা দেওয়াই উত্তেজিত বা উত্তেজতা নামে পরিচিত। জীবদেহের নিজের চেষ্টায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করাকে সঞ্চালন বা চলন বলে। স্বেচ্ছায় জীবের সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন কে আবার গমন বলে।

চলন কাকে বলে (চলনের সংজ্ঞা)

চলন ও গমন
চলন ও গমন

নির্দিষ্ট স্থানে সংলগ্ণ থাকাকালীন বাইরের উদ্দীপকের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতিতে জৈবিক প্রয়োজনের আভ্যন্তরীণ তাগিদে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনকে চলন বা মুভমেন্ট বলে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, চলন হলো জীবদেহের অংশবিশেষের আন্দোলিত হওয়া।

চলনের উদাহরণ

ভলভক্স, ক্ল্যামাইডোমোনাস ইত্যাদি কয়েকটি নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদে ব্যতীত সমস্ত উদ্ভিদ জগতে চলন পরিলক্ষিত হয়। আবার অবেলিয়া কলোনির স্পন্স প্রবাল ইত্যাদি কয়েকটি প্রাণী গমনে অক্ষম চলনই এদের সম্বল।

গমন কি বা কাকে বলে (গমনের সংজ্ঞা)

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালনার দ্বারা নিজের প্রচেষ্টায় সমগ্র জীবদেহের একস্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়া বা নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য কোন দূরত্ব অতিক্রম করাকেই গমন বা লোকমোশন বলে।

গমনের উদাহরণ

স্পঞ্জ প্রবাল ওবেলিয়া কলোনি প্রভৃতি প্রাণী ব্যতীত সমস্ত প্রাণীতে এবং ভলভক্স ক্লাইমোডোমোনাস সহ কয়েকটি নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদে কোন পরিলক্ষিত হয়।

চলন ও গমনের উদ্দেশ্য, গুরুত্ব বা তাৎপর্য

উদ্ভিদ ও প্রাণীর চলন ও গমনের উদ্দেশ্য , গুরুত্ব বা তাৎপর্য বহুবিধ। জীবনের বিভিন্ন জৈবিক ধর্ম পালনের জন্য জীবের চলন ও গমন অপরিহার্য। প্রধানত নিম্নলিখিত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য উদ্ভিদ ও প্রানীদের চলন ও গমন হয়। নিচে চলন ও গমনের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করা হল

  1. খাদ্যান্বেষণ : অধিকাংশ উদ্ভিদ খাদ্য বিষয়ে স্ব-নির্ভর হওয়ায় এবং তাদের প্রয়ােজনীয় খাদ্য উপাদান একস্থান থেকে সংগ্রহ করার সুবিধা থাকায় উদ্ভিদদের সাধারণত স্থানান্তরে গমনের প্রয়ােজন হয় না। তবে উদ্ভিদের মূল জল সংগ্রহের জন্য জলের দিকে অগ্রসর হয়। কিছু নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদও খাদ্যান্বেষণের জন্য স্থানান্তরিত হয়। প্রাণীরা খাদ্য-বিষয়ে স্বনির্ভর নয়, তাই খাদ্যান্বেষণের জন্য তাদের স্থানান্তরে গমন করতে হয়।

প্রাণীর গমন
প্রাণীর গমন
  1. আশ্রয়: সুষ্ঠভাবে জীবন-যাপন ও জৈবিক ক্রিয়া-কলাপ সম্পন্নের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর় নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়ােজন। প্রাণীদের বাসস্থান খোঁজা বা বাসস্থান নির্মাণের জন্য স্থানান্তরে গমন করতে হয়।
  2. আত্মরক্ষা : শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্য প্রাণীদের স্থানান্তরে গমন করতে হয়।
  3. প্রজনন : প্রজনন অর্থাৎ বংশবিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রাণীদের গমনের প্রয়ােজন হয়। নিভৃত প্রজনন স্থান ও উপযুক্ত সঙ্গী বা সঙ্গিনী খোঁজার জন্য প্রাণীদের স্থানান্তরে গমনের প্রয়ােজন হয়। একই কারণে কিছু নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদেরও (শৈবালের) গমনের বা চলনের প্রয়ােজন হয়।
  4. অনুকুল পরিবেশের সন্ধান : উপযুক্ত পরিমাণ আলাে, বাতাস এবং জল পাওয়ার জন্য উদ্ভিদ বা উদ্ভিদ-অঙ্গের চলন হয়। অনেক প্রাণীও অনুকুল পরিবেশের সন্ধানে স্থানান্তরে গমন করে।
  5. অভিযোজন : পরিবর্তনশীল পরিবেশের সহিত নিজেকে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজনের তাগিদে চলন ও গমনের প্রয়োজন হয়।

চলন ও গমনের মধ্যে পার্থক্য

একটু বিশেষভাবে নজরপাত করলে চলন ও গমনের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। চলন ও গমনের প্রধান পার্থক্য হল,
চলনে জীবের সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন হয়না, গমনে জীবের সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, গমনের সময় জীব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন হয়।

চলন গমন
১. স্থান ত্যাগ না করে জীবদেহের অংশবিশেষ কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করাকে চলন বা মুভমেন্ট বলে।১. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালনার তারা সমগ্র জীবদেহের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া বা নির্দিষ্ট ও পরিবহন যোগ্য কোন দূরত্ব অতিক্রম করাকে গমন বা লোকমোশন বলে।
২. কেবলমাত্র ভলভক্স, ক্লাইমোডোমোনাস ইত্যাদি কয়েকটি নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদে দেখতে পাওয়া যায়।২. স্পঞ্জ প্রবাল ইত্যাদি কয়েকটি প্রাণী গমনে অক্ষম।
৩. চলন প্রক্রিয়ায় জীব এর সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন হয়না।৩. কমন প্রক্রিয়ায় জীব এর সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন হয়।
৪. এই প্রক্রিয়ায় জীব এর অঙ্গ বিশেষের সঞ্চালন ঘটে৪. এই প্রক্রিয়ায় জীব এর সামগ্রিক দেহের সঞ্চালন ঘটে।
৫. কোন নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থেকে চলন সম্ভব।৫. কোন নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থেকে গমন সম্ভব নয়।
৬. প্রায় সমস্ত জীবদেহে চলন সঞ্চালন পরিলক্ষিত হয়৬. কয়েকটি নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদে এবং প্রায় সব রকমের প্রাণী দেহে গমন পরিলক্ষিত হয়।
৭. চলন হলেই গমন হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।৭. গমন হলেই চলন অবশ্যই হবে।
চলন ও গমনের পার্থক্য

চলন কত প্রকার ও কি কি

চলন গমন কত প্রকার ও কি কি জানার আগে নিম্নালচিত বিষয় জানা উচিৎ। অধিকাংশ উদ্ভিদ মাটি সংলগ্ন থাকে বলে উদ্ভিদ-জগতে গমন বা লােকোমােশান একান্তই সীমিত—পক্ষান্তরে, বহুবিধ চলন বা মুভমেন্ট পরিলক্ষিত ।

উদ্ভিদের চলন কত প্রকার ও কি কি

উদ্ভিদ-জগতে গমন সীমিত হলেও আমরা স্বতঃস্ফুর্ত ও ট্যাকটিক বা উদ্দীপক-নির্ণীত গমন দেখতে পাই। অধিকাংশ উদ্ভিদেই গমন-অঙ্গ অনুপস্থিত ।

অধিকাংশ উদ্ভিদেরই নির্দিষ্ট কোন গমন-অঙ্গ নেই।

অধিকাংশ উদ্ভিদের প্রাণিদের মত নির্দিষ্ট কোন গমন-অঙ্গ নেই। কেবলমাত্র ক্ল্যামাইডামােনাস, ভলভক্স প্রভৃতি কয়েকটি এককোষী নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদ ফ্ল্যাজেলার সাহায্যে একস্থান হতে অন্যস্থানে গমনে সক্ষম। উচ্চশ্রেণীর উদ্ভিদ মূল, কাণ্ড, পাতা প্রভৃতি অঙ্গকে – প্রয়ােজনে সঞ্চালন করতে পারে।

উদ্ভিদদেহে কোন গমনাঙ্গ না থাকলেও নিম্নশ্রণীর উদ্ভিদে গমন প্রক্রিয়া সম্পাদনে সিলিয়া, ফ্লাজেলা প্রভৃতি সরু সরু সূতার ন্যায় আকৃতি পরিলক্ষিত হয়। আর এই গমন বিশেষপর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ হওয়ায় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এই বিশেষ ধরনের গমনকে গমন না বলে একপ্রকার গমন-জনিত চলন বা সামগ্রিক চলন (Movement of Locomotion) নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। অতএব ক্ল্যামাইডােমােনাস, ভলভক্স, ডায়াটম, স্ফিরেলা (Sphaerella) প্রভৃতি সহ কতগুলি স্বাধীনজীবী এককোষী উদ্ভিদের গমনকে সামগ্রিক চলন বলে। চলনের ইংরাজী Movement ; কিন্তু এক্ষেত্রে সামগ্রিক চলনের ইংরাজী করা হইয়াছে Movement of Locomotion অর্থাৎ গমন-জনিত চলন।

তাহলে চলন কত প্রকার আলোচনা করতে হলে আমরা আলোচনার সুবিধার্থে শুধুমাত্র উদ্ভিদের চলনের শ্রেণীবিভাগ করতে পারি। এই পর্বে আমরা শুধু চলন এর শ্রেণীবিভাগ সম্বন্ধে জানবো; চলন এর শ্রেণীবিভাগ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে আমরা পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব।
উদ্ভিদের চলন প্রধানত দুই প্রকার, যথা
১. সামগ্রিক চলন এবং
২. বক্রতা জনিত চলন বা বক্র চলন

১. সামগ্রিক চলন আবার দুই প্রকার; যথা
ক) স্বতঃস্ফূর্ত সামগ্রিক চলন এবং
খ) ট্যাকটিক বা উদ্দীপক নির্ণীত সামগ্রিক চলন।

এরা প্রত্যেকে আবার তিন ভাগে বিভক্ত।

ক) স্বতঃস্ফূর্ত সামগ্রিক চলন আবার তিন প্রকারের; যথা
i) প্রোটোপ্লাজমীয়
অ) আবর্ত প্রবাহ
আ) সংবহন
ii) অ্যামিবয়েড
iii) সিলিয়ারি বা শুঙ্গগতি

খ) আবিষ্ট চলন বা ট্যাকটিক বা উদ্দীপক নির্ণীত
i) ফটোট্যাকটিক
ii) কেমোট্যাকটিক
iii) থার্মোট্যাকটিক

২. এবার আমরা বক্র চলনের শ্রেণীবিভাগ সম্বন্ধে জানবো
বক্র চলন আবার প্রধানত দুই প্রকারের; যথা
ক) স্বতঃস্ফূর্ত বক্র চলন এবং
খ) আবিষ্ট বক্র চলন

এদেরকে আবার বিভিন্ন শ্রেণীতে শ্রেণীবিভক্ত করা হয়; যথা

ক) স্বতঃস্ফূর্ত বক্র চলন আবার দুই প্রকারের হয়; যথা
i) বৃদ্ধিজ চলন
অ) নিউটেশন
আ) হাইপোন্যাস্টি
ই) এপিনাস্টি এছাড়াও আরও একটি ভাগ আছে
ঈ) সরকামনিউটেশন
ii) প্রকরণ

খ) আবিষ্ট চলন আবার প্রধানত দুই প্রকার; যথা
i) ট্রপিক চলন
অ) ফটোট্রপিক
আ) জিওট্রপিক
ই) হাইড্রো ট্রপিক এছাড়াও আরও একটি ভাগ আছে
ঈ) হেপ্টো ট্রপিক

ii) ন্যাস্টিক
অ) ফটনাস্টি
আ) থার্মো ন্যাস্টি
ই) কেমোন্যাস্টি
ঈ) সিসমোন্যাস্টি এছাড়াও আরও একটি ভাগ আছে
উ) নিক্টিন্যাস্টি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here