আলোর প্রতিসরণ |প্রতিসরণের নিয়ম ও সূত্র |আলোর প্রতিসরাঙ্ক ও স্নেলের সূত্র

0
17895

আলোর প্রতিসরণ

সূচীপত্র দেখতে ক্লিক করুন show

স্বচ্ছ এবং সমসত্ব মাধ্যমের মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি সরলরেখায় চলে।

প্রতিসরণ কাকে বলে

আলোক রশ্মি যখন এক মাধ্যম থেকে অন্য আরেকটি স্বচ্ছ মাধ্যমের উপর তীর্যকভাবে আপতিত হয়, তখন দুই মাধ্যমের বিভেদ তলে ওই রশ্মির অভিমুখের পরিবর্তন হয়। দ্বিতীয় মাধ্যমে আলোর রশ্মির এই রকম দিক পরিবর্তন করার ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ বলে।

প্রমাণ বা ব্যাখ্যা
আলোর প্রতিসরণ
আলোর প্রতিসরণ

ধরি, বায়ু এবং কাঁচ মাধ্যম দুটোর বিভেদতল PQ। AB আলোকরশ্মি বায়ু মাধ্যম থেকে কাচ মাধ্যমে তীর্যকভাবে আপতিত হয়ে কাচের মধ্যে প্রবেশ করে। প্রবেশ করার সময় বিভেদ তল থেকে দিক পরিবর্তন করে BC পথে যায় । দুই মাধ্যমের বিভেদ তল PQ এর ওপর B বিন্দুতে NBN’ লম্ব টানো হলো। NBN’কে আপাতন বিন্দুতে বিভেদ তলের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব বলা হয়। এখানে AB হল আপতিত রশ্মি এবং BC হল প্রতিসৃত রশ্মী। আপতিত রশ্মি AB অভিলম্ব NBN’এর সঙ্গে যে কোন উৎপন্ন করে, তাকে আপতন কোণ বলে। এখানে ∠ABN আপতন কোণ। একে i দ্বারা প্রকাশ করা হয়। প্রতিসৃত রশ্মী BC, অভিলম্ব NBN’এর সঙ্গে যে কোন উৎপন্ন করে, তাকে প্রতিসরণ কোণ বলে। এখানে ∠N’BC প্রতিসরণ কোণ। একে r দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

প্রতিসরণের নিয়ম

যখন আলোক রশ্মি এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যায় তখন আলোকরশ্মির প্রতিসরণ ঘটে। তবে, প্রতিসরণ কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ঘটে। নিচে প্রতিসরণের নিয়মগুলি দেওয়া হল।

১. লঘু মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে আলোকরশ্মির প্রতিসরণের নিয়ম

আলোকরশ্মি যখন লঘু মাধ্যম (যেমন বায়ু) থেকে ঘন মাধ্যমে (যেমন কাঁচ) প্রবেশ করে, তখন প্রতিসৃত রশ্মী অভিলম্বের দিকে সরে আসে। তাই এক্ষেত্রে প্রতিসরণ কোণের মান আপাতন কোণের মানের চেয়ে কম হয়। এক্ষেত্রে আপতন কোণ i প্রতিসরণ কোণ r এর চেয়ে বড় হয় অর্থাৎ i>r হবে।

২. ঘণমাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে আলোকরশ্মির প্রতিসরণের নিয়ম

আলোকরশ্মি যখন ঘন মাধ্যম (যেমন কাচ) থেকে লঘু মাধ্যমে (যেমন বায়ু) প্রবেশ করে, তখন প্রতিসৃত রশ্মী অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। অর্থাৎ প্রতিসরণ কোণ আপতন কোণের চেয়ে বেশি হয়। এক্ষেত্রে r>i হবে।

৩. দুটি মাধ্যমের বিভেদ তলে লম্বভাবে আপতিত হলে আলোকরশ্মির প্রতিসরণের নিয়ম

আলোকরশ্মি লঘু মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে বা ঘণ মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রতিসৃত হওয়ার সময় যদি বিভেদ তলের উপর লম্বভাবে আপতিত হয়, তবে ওই রশ্মি কোন রকম চ্যুতি না ঘটিয়ে প্রথম মাধ্যম থেকে সরাসরি দ্বিতীয় মাধ্যমে প্রবেশ করে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে i = r = 0°।

৪. বিভিন্ন রংয়ের বর্ণের প্রতিসরণের নিয়ম

বিভিন্ন বর্ণের আলোকরশ্মি দুই মাধ্যমের বিভেদ তলের উপর একই কোনে আপতিত হলেও তারা বিভিন্ন কোণে প্রতিসৃত হয়। লাল বর্ণের আলোর ক্ষেত্রে প্রতিসরণ কোণ অন্যান্য বর্ণের আলোর প্রতিসরণ কোণের চেয়ে বেশি হয়।

৫. আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মী এবং দুই মাধ্যমের বিভেদ তলে অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।

আলোর প্রতিসরণের সূত্র

এক মাধ্যম থেকে অন্য কোন সমসত্ত্ব মাধ্যমে প্রতিসৃত হওয়ার সময় আলোর রশ্মি যে দুটি সূত্র মেনে চলে তাদের প্রতিসরণের সূত্র বলে। প্রতিসরণের সূত্র দুটি নিচে দেওয়া হল।

১. আলোর প্রতিসরণের প্রথম সূত্র
আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মী এবং দুই মাধ্যমের বিভেদ তলের উপর আপতন বিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
২. আলোর প্রতিসরণের দ্বিতীয় সূত্র
দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট রঙের আলোর সাপেক্ষে আপতন কোণের সাইন এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক হয়। এই দুর্ভোগ থেকে  μ মিউ অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এই সূত্রটিকে স্নেলের সূত্র বলে।

ধ্রুবক  (μ) মিউকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক বলে।

আলোর প্রতিসরাঙ্ক

কোন আলোক রশ্মি এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রতিসৃত হলে যদি আলোকরশ্মির আপতন কোণ i এবং প্রতিসরণ কোণ r হয় তবে,
sin i/sin r =  μ মিউ = ধ্রুবক
এই ধ্রুবকটিকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক বলে। প্রতিসরাঙ্কের মান আলোর রংএর উপর নির্ভর করে। প্রথম মাধ্যমটির শূন্য হলে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ককে মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক বলে।
উদাহরণ
বায়ুর সাপেক্ষে জলের প্রতিসরাঙ্ক 1.33 বলতে বোঝায় যে, আলোকরশ্মি বায়ু থেকে জলে প্রতিসৃত হলে ওই রশ্মির আপতন কোণ এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের অনুপাত 1.33 হবে।

স্নেলের সূত্র

স্নেলের সূত্র অনুসারে ( sin i ) / (sin r) =  μ
বা, sin i =  μ sin r যেখানে  μ একটি ধনাত্মক রাশি।
এখন আপাতন কোন i = 0° হলে,  μ. sin r = 0
বা, sin r = 0 (যেহেতু  μ ≠ 0)
অতএব, r = 0
অর্থাৎ, কোন মাধ্যম থেকে আগত আলোকরশ্মি দ্বিতীয় কোন মাধ্যমের তলের উপর লম্বভাবে আপতিত হলে ওই রশ্মি সোজাসুজিভাবে দ্বিতীয় মাধ্যমে প্রতিসৃত হবে

আলোর প্রতিসরণের বাস্তব প্রয়োগ এবং উদাহরণ

এতক্ষন পর্যন্ত আমার প্রতিসরণ নিয়ে যে আলোচনা করলাম সেগুলি সম্পূর্ণভাবে কাগজে কলমে শিখলাম। এখন আমরা আলোর প্রতিসরণের বাস্তব প্রয়োগ এবং উদাহরণ আলোচনা করব।

১. ঘন মাধ্যমে অবস্থিত কোন বস্তুকে লঘু মাধ্যম থেকে দেখলে বস্তুটি উপরের দিকে উঠে এসেছে বলে মনে হবে।

ঘন-মাধ্যম-থেকে-লঘু-মাধ্যমে-আলোর-প্রতিসরন
ঘন-মাধ্যম-থেকে-লঘু-মাধ্যমে-আলোর-প্রতিসরন

ধরি, একটি জলভর্তি চৌবাচ্চার তলায় P, Q এবং R প্রভৃতি কয়েকটি বস্তু বিন্দু আছে। এখন যদি চৌবাচ্চার উপরে বায়ু মাধ্যম থেকে P এর দিকে দেখি, তবে P থেকে অপসারী আলোকরশ্মি নির্গত হয়ে বাতাসে প্রবেশ করবে। ঘনতর মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রবেশ করার ফলে, ওরা অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যাবে এবং আরও অপসারী হয়ে চোখে পড়বে। ফলে, মনে হবে রশ্মিগুলি কাছের কোন বিন্দু P1 থেকে আসছে। এইজন্য P বিন্দুটি কিছু উপরে P1এ উঠে এসেছে বলে মনে হবে।
চোখ ওই জায়গায় রেখে Q এবং Rকে দেখলে, ওইগুলি থেকে নির্গত আলোকরশ্মি আরও তীর্যকভাবে জলতলে আপতিত হবে এবং বাতাসের মধ্যে প্রতিসৃত রশ্মী অভিলম্ব থেকে আরও দূরে সরে যাবে। অর্থাৎ, আরও বেঁকে চোখে পড়বে। ফলে Q বস্তুটির প্রতিবিম্ব Q1 এবং R বস্তুর প্রতিবিম্ব R1 অবস্থানে দেখা যাবে, ফলে P1 এর চেয়ে Q1কে আরও উপরে দেখাবে এবং R1কে Q1এর চেয়ে আরো উপরে আছে বলে মনে হবে। এই জন্য কোন জলাশয়ে দাঁড়িয়ে তলদেশের দিকে দেখলে যেখানে জলের মধ্যে দাঁড়ানো হয় সেই জায়গাটি সবচেয়ে গভীর বলে মনে হয় এবং একটু দূরের তলদেশ অপেক্ষাকৃত কম গভীর বলে মনে হয়।

২. সাদা কাগজের উপর একটা কালির ফোঁটা এঁকে ফোটাটিকে কোন আয়তাকার কাঁচ ফলকের নিচে রেখে ফলকের উপর থেকে ফোঁটাটিকে সোজা দেখলে মনে হবে ফোটাটি কিছুটা উপরে উঠে এসেছে। আলোর প্রতিসরণের জন্য এরকম ঘটে।

প্রতিসরণের-ফলে-বস্তুর-স্থান-পরিবর্তন
প্রতিসরণের-ফলে-বস্তুর-স্থান-পরিবর্তন

ধরা যাক, কালির ফোঁটাটি কাঁচ ফলকের নিচে O বিন্দুতে রয়েছে। এখন O বিন্দু থেকে আগত আলোক রশ্মি ঘনতর মাধ্যম কাঁচ থেকে লঘুতর মাধ্যম বায়ুতে প্রতিসৃত হচ্ছে। ফলে, প্রতিসৃত রশ্মী, মাধ্যম দুটি বিভেদ তলের আপাতন বিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যাবে। ওই প্রতিসৃত রশ্মিগুলিকে অভিমুখের বিপরীত দিকে বাড়ালে O বিন্দুর কিছুটা উপরে O’ বিন্দুতে কালির ফোটার অসদ প্রতিবিম্ব গঠিত হবে – যে কারণে পর্যবেক্ষক O বিন্দুতে থাকা কালির ফোঁটাটিকে O’ বিন্দুতে দেখতে পাবে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষকের কাছে কালির ফোঁটাটি কিছুটা উপরে উঠে এসেছে বলে মনে হবে।

৩. একটি সোজা দণ্ডের কিছু অংশকে তীর্যকভাবে জলে ডোবালে জল ও বায়ুর সংযোগস্থল থেকে দন্ডটিকে গেছে বলে মনে হবে।

একটি সোজা দণ্ডের কিছু অংশকে তীর্যকভাবে জলে ডোবালে জল ও বায়ুর সংযোগস্থল থেকে দন্ডটি বেকে গেছে বলে মনে হবে। কারণ দণ্ডের যে অংশ জলের উপরে থাকে, সেই অংশ থেকে আলোর রশ্মি সরাসরি আমাদের চোখে আসে এবং আমরা দন্ডটির ওই অংশকে প্রকৃত স্থানে দেখতে পাই। কিন্তু দন্ডের যে অংশ জলের মধ্যে থাকে, সেই অংশ থেকে আগত আলোকরশ্মি যখন প্রতিসৃত হয়ে লঘুতর মাধ্যম বায়ুতে আসে তখন প্রতিসরণ কোণ আপতন কোণ থেকে বেশি হয়। ফলে, প্রতিসৃত রশ্মিগুলো অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। ওই প্রতিশ্রুত রশ্মি গুলো চোখে পৌঁছালে দন্ডটির প্রকৃত অবস্থানের কিছু উপরে আমরা দন্ডটির জলে নিমজ্জিত অংশের অসদ প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। অর্থাৎ দন্ডটির জলের বাইরের অংশ এবং জলের ভিতরের অংশের প্রতিবিম্ব একই সরলরেখায় না থাকায় দন্ডটিকে বাঁকা দেখায়।

৪. অদৃশ্য মুদ্রকে দৃশ্য করা

প্রতিসরণ-ও-মুদ্রার স্থান পরিবর্তন
প্রতিসরণ-ও-মুদ্রার স্থান পরিবর্তন

একটি পাত্রের ভিতরের তলে একটি মুদ্রা রেখে, পাত্রটিকে সরিয়ে এমন অবস্থানে রাখা হল যেন মুদ্রাটি পাত্রের দেয়ালের আড়ালে ঢাকা পড়ে। এখন চোখকে ওই একই জায়গায় রেখে বাটির মধ্যে জল ঢেলে ভর্তি করা হল। এই অবস্থায় বাটির মধ্যে যে মুদ্রাটি ছিল তাকে চোখে দেখা যাবে।
কারণ জলের মধ্যে থাকা মুদ্রাটি থেকে আগত OA এবং OB রশ্মি জলের উপরের তলে আপতিত হয়ে বায়ুতে প্রতিসৃত হলে প্রতিসরণ কোণ আপতন কোণ অপেক্ষা বেশি হবে। ফলে প্রতিসৃত রশ্মী দুটি যথাক্রমে AC ও BD রশ্মি রূপে পর্যবেক্ষকের চোখে প্রবেশ করবে। তখন মুদ্রাটির প্রকৃত অবস্থানের কিছু উপরে মুদ্রাটির অসদ প্রতিবিম্ব গঠিত হবে এবং পর্যবেক্ষক O’ অবস্থানে মুদ্রাটির প্রতিবিম্বকে দেখতে পাবে।

বায়ুমন্ডলে আলোর প্রতিসরণ

বায়ু একটি স্বচ্ছ মাধ্যম। কিন্তু বায়ুমন্ডলে আলোর প্রতিসরণ লক্ষ্য করা যায়। নিচের দৃষ্টান্ত থেকে আমরা বায়ুমন্ডলে আলোর প্রতিসরণ সম্বন্ধে জানতে পারব।

সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে বা সূর্যাস্তের কিছুর পরেও আমরা সূর্যকে দেখতে পাই

সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে বা সূর্যাস্তের কিছুর পরেও আমরা সূর্যকে দেখতে পাই। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যত উপরে যাওয়া যায় ততই বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব কমতে থাকে। সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে বা সূর্যাস্তের কিছু পরে সূর্য যখন দিগন্তরেখার ঠিক নিচে থাকে তখন সূর্যের রশ্মিগুলো লঘু মাধ্যম থেকে ক্রমাগত ঘনতর বায়ুস্তরের ভিতর দিয়ে আসার সময় প্রতিসরণের ফলে বেঁকে যায়। এর ফলে রশ্মিগুলি প্রতিবার প্রতিসরণে অভিলম্বের দিকে সরতে থাকে এবং বাঁকা পথে দর্শকের চোখে এসে পৌঁছায়। এই অবস্থায় দর্শক ভূপৃষ্ঠের কিছু উপরে সূর্যের প্রতিবিম্বকে দেখতে পায়। ফলে সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে এবং সূর্যাস্তের কিছু পরেও সূর্যকে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে, ওই সময় আমরা সূর্যের প্রতিবিম্ব দেখে থাকি।

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে সামান্য উপবৃত্তাকার দেখায় কেন

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে সামান্য উপবৃত্তাকার দেখায়। এই সময় সূর্যের নিচের প্রান্ত উপরের প্রান্ত থেকে দিগন্তের বেশি কাছে থাকে । ফলে, সূর্যের নিচের প্রান্ত থেকে আগত আলোকরশ্মিগুচ্ছ বিভিন্ন বায়ুস্তরের মধ্যে দিয়ে আসার সময় প্রতিসরণের জন্য বেশি বেগে যায়। কিন্তু উপরের প্রান্ত থেকে আগত রশ্মিগুচ্ছ অপেক্ষাকৃত কম বাঁকে। ফলে সূর্যের নিচের অংশের আপাত উন্নতি উপরের অংশ থেকে কম হয়। এজন্য সূর্যের উলম্ব ব্যাস অনুভূমিক ব্যাসের তুলনায় কিছু কম মনে হয়। তাই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে উপবৃত্তাকার দেখায়।

আলোর প্রতিসরণ সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

নক্ষত্র মিটমিট করে কেন

রাতের আকাশে নক্ষত্রগুলো ঝিকমিক করে বা মিটমিট করে। শূন্য মাধ্যমেও আলোর গতিবেগ এর কারনে রশ্মিগুলি পৃথিবীতে এসে পৌছায়। কারণ পৃথিবীর উপরে প্রায় 400 কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাস আছে। এই বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের ঘনত্ব বিভিন্ন। তাছাড়া বায়ুর স্তরগুলির উষ্ণতা প্রতিমুহূর্তে বদলায় বলে ওই বায়ুর স্তরগুলির ঘনত্ব এবং প্রতিসারঙ্ক প্রতিমুহূর্তে বদলায়। নক্ষত্রগুলো পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত। নক্ষত্রের নিজস্ব আলো আছে। নক্ষত্র থেকে আগত আলোকরশ্মি বহুদূর থেকে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন ঘনত্বের স্তরগুলির মধ্যে দিয়ে আসে। ওই স্তরগুলির প্রতিসরাঙ্ক প্রতিমুহূর্তে বদলানোর জন্য ওই আলোকরশ্মির গতিপথের অনবরত পরিবর্তন ঘটে। সেই জন্য দর্শকের চোখে কখনো কম, কখনো বেশি আলোকরশ্মি এসে পৌঁছায়। তাই নক্ষত্র মিটমিট করে জ্বলে বলে মনে হয়।
অপরপক্ষে গ্রহগুলো নক্ষত্রের তুলনায় কম দূরত্বে থাকায়, গ্রহ গুলো থেকে আগত রশ্মির দিক পরিবর্তন অনেক কম হয়। এই কারণে গ্রহগুলোকে স্থির দেখায়।

তেলে ভেজানো কাগজ সামান্য স্বচ্ছ দেখায় কেন

তেলে ভেজানো কাগজ সামান্য স্বচ্ছ দেখায়। কাগজ তল অমসৃণ, তাই এর ওপর আলোকরশ্মি পড়লে বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন হয়। তেলে ভেজানো কাগজে, স্বচ্ছ তেল কাগজের ফাঁকে ঢুকে যায়, ফলে ওর উপর আলোকরশ্মি পড়লে প্রতিসৃত হয়, তাই কাগজটিকে সামান্য স্বচ্ছ দেখায়।

স্বচ্ছ কাচগুড়ো করলে অস্বচ্ছ দেখায়, কিন্তু কাঁচগুড়োয় জল ঢাললে পুনরায় স্বচ্ছ দেখায় কেন?

স্বচ্ছ কাঁচকে গুঁড়ো করলে কাঁচগুড়োর উপর আলোকরশ্মির বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন ঘটে। ফলে, গুড়ো কাঁচ অস্বচ্ছ দেখায়। কিন্তু ওই কাঁচগুড়োতে অল্প জল ঢাললে কাচগুড়োর অমসৃণ তলে জল প্রবেশ করে। এখন কাঁচ ও জলের মধ্যে আলোর বেগের পার্থক্য সামান্য হওয়ায় জলে ভেজা কাচের গুড়োর উপর আলো আপতিত হলে কাঁচ ও জলের বিভেদ তলের ভিতর দিয়ে আলোর প্রতিসরণ ঘটে। যে কারণে ভিজে কাচগুড়োকে স্বচ্ছ দেখায়।

জলের মধ্যে থাকা মাছকে জলের উপর থেকে লক্ষ্য করে বর্ষা বিদ্ধ করা যায় না কেন

জলের ভিতর থাকা মাছকে জলের উপর থেকে লক্ষ্য করে বর্ষাবিদ্ধ করা যায় না; কারণ জল মাধ্যমে থাকা কোন মাছ থেকে আগত আলোকরশ্মিগুলো লঘু মাধ্যম বায়ুতে প্রতিসৃত হলে প্রতিসরণ কোণের মান আপতন কোণের চেয়ে বেশি হয়। ফলে, জলের উপর থেকে দেখলে মাছটির সঠিক অবস্থানের কিছু উপরে মাছটির অসদ প্রতিবিম্ব দেখা যাবে। এই জন্য জলের উপর থেকে মাছটিকে লক্ষ্য করে বর্ষা ছুড়ে জলের মধ্যে থাকা মাছটিকে বর্ষাবিদ্ধ করা যায় না। মাছটিকে বর্ষাবিদ্ধ করতে হলে মাছের আপাত অবস্থানের কিছু নিচে লক্ষ্য করে বর্ষা ঝরতে হয়।

জলভর্তি চৌবাচ্চার গভীরতা তার প্রকৃত গভীরতার চেয়ে কম বলে মনে হয় কেন

জলভর্তি চৌবাচ্চার গভীরতা তার প্রকৃত গভীরতার চেয়ে কম হয় তার কারণ জলপূর্ণ চৌবাচ্চা তলদেশ থেকে আগত অপসারী আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রতিসৃত হয়ে আরও অপসারী হয় এবং ওই অপসারী রশ্মিগুচ্ছ আমাদের চোখে আপতিত হলে আমরা চৌবাচ্চার তলদেশের কিছু উপরে ওই তলদেশের অসদ প্রতিবিম্বকে দেখতে পাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here