আলোর গতিবেগ ও বিস্তার | আলোকবর্ষ কি ও মান কত?

0
3508

আলোর বিস্তার

আলো তীব্র বেগে চলে। শব্দের মতো আলোর গতিবেগ আছে। সমসত্ত্ব মাধ্যমে আলো সব দিকে সরলরেখায় চলে বলে ধরা হয়। পুকুরের জলে একটা ঢিল ফেললে দেখা যায় ছোট ছোট ঢেউ উৎপন্ন হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে যায় এবং পাড়ে এসে একের পর এক আছড়ে পড়ে। কিন্তু আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিক্ষুদ্র হওয়ায় আলো সরলরেখায় চলে বলে মনে হয়। ঠিক এইভাবে কোন জায়গায় আলো জ্বালালে সেখান থেকে আলোক তরঙ্গ একটা নির্দিষ্ট বেগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই আলোক তরঙ্গ দূরের কোনো লোকের চোখে এসে পড়লে লোকটি আলোর উৎসকে দেখতে পায়।

কিন্তু তরঙ্গ সৃষ্টির জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। সেই কারণে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে ইথার নামে এক ভারী মাধ্যম কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে অধিকাংশ স্থানই শুণ্য। অতএব, শূন্য মাধ্যমের ভিতর দিয়েও আলো চলাচল করতে পারে। আলোর প্রকৃতি সম্পর্কে যখন নানান চিন্তাভাবনা চলছে, কখন বিজ্ঞানী ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তার তাত্ত্বিক গবেষণার সাহায্যে দেখালেন যে, আলো এক রকমের তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, যা শূন্য মাধ্যম থেকেও স্বচ্ছন্দে অগ্রসর হতে পারে। অর্থাৎ আলোর বিস্তারের জন্য ইথার মাধ্যমের কল্পনা করার প্রয়োজন হয় না।

বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে আলো হল ছোট ছোট শক্তিকণার সমষ্টি। এই কনাগুলিকে ফোটন বলে। উৎস থেকে নির্গত আলোকশক্তি এই ফোটন কণার সাহায্যে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

আলোর বিস্তার সম্পর্কে বর্তমানে বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, আলোর তরঙ্গ ধর্ম ও কনিকা ধর্ম আছে। অর্থাৎ, আলো কখনো শক্তি কোন হিসাবে, আবার কখনো তরঙ্গের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তাই আলোর মধ্যে ‘দ্বৈত প্রকৃতি’ দেখা যায়।

আলোর বেগ

আলোর গতিবেগ এত তীব্র হওয়া সত্ত্বেও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে আলোরও কিছু সময় লাগে। তবে আলোর গতিবেগ এত তীব্র যে, আমাদের জানা কোন গতিবেগের সঙ্গে এর তুলনা করা যায় না। আলোর তীব্র গতিবেগের জন্য মনে হয় যে, আলোর গতিতে কোন সময় লাগে না। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব 15 কোটি কিলোমিটার। কিন্তু এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে আলোর সময় লাগে 8.3 মিনিট মাত্র। অর্থাৎ 1 সেকেন্ডে আলো পৃথিবীকে 7 বার ঘুরে আসতে পারে। আকাশের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সাইরাস থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছতে সময় লাগে 8.8 বছর।

1676 সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানের রোমার সর্বপ্রথম আলোর গতিবেগ নির্ণয় করেন। রোমার বৃহস্পতি গ্রহের সবচেয়ে নিকটতম উপগ্রহের গ্রহণ লক্ষ্য করেন। পৃথিবী এবং বৃহস্পতি যখন পরস্পরের সবচেয়ে নিকটতম অবস্থানে থাকে, তখন তিনি ওই উপগ্রহের পরপর দুটি গ্রহণের সময়ের পার্থক্য লক্ষ্য করেন। আবার পৃথিবী ও বৃহস্পতি যখন পরস্পর থেকে সবচেয়ে দূরতম অবস্থানে থাকে, তখনো তিনি উপগ্রহটির পরপর দুটি গ্রহণের সময়ের পার্থক্য লক্ষ্য করেন। এই দুই অবস্থানে উপগ্রহটির পরপর দুটি গ্রহণের সময়ের পার্থক্য থেকে হিসাব করে তিনি আলোকের গতিবেগ নির্ণয় করেন । যা হলো সেকেন্ডে 186000 মাইল।

পরে ব্রাডলি, ফিযো, ফুকো, মাইকেলসন প্রমূখ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাহায্যে আলোর বেগ নির্ণয় করেন। সর্বাধুনিক পরিমাপ অনুযায়ী শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে 299774 কিলোমিটার বা 186285 মাইল/সেকেন্ড। আলোর এই বেগকে C অক্ষর দ্বারা প্রকাশ করা হয়। শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ C = 3×108 মিটার/সেকেন্ড।

আলোর গতিবেগের বৈশিষ্ট্য

১. শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ পদার্থবিজ্ঞান এর একটি মৌলিক ধ্রুবক। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদে দেখিয়েছেন যে, এই বিশ্বে কোন বস্তু বা শক্তির গতিবেগ শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ চরম ও পর্যবেক্ষক নিরপেক্ষ। অর্থাৎ দুজন ব্যক্তির মধ্যে আপেক্ষিক গতি যাই হোক না কেন, তাদের উভয়ের কাছে আলোর গতিবেগ একই হবে। ঘনতর মাধ্যমের তুলনায় লঘুতর মাধ্যমে আলোর বেগ বেশি হয়।

২. বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর গতিবেগ বিভিন্ন হয়

কোন মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক

শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ এবং অন্য কোন মাধ্যমে আলোর গতিবেগের অনুপাতকে ওই মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক বলে।
নির্দিষ্ট কোন মাধ্যমে আলোর গতিবেগ ওই মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্কের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক হয়। নির্দিষ্ট কোন মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক μ হলে
নির্দিষ্ট মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক μ = (শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ)/(ও মাধ্যমে আলোর বেগ)
অতএব, নির্দিষ্ট মাধ্যমে আলোর বেগ =1/μ×শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ।
স্বচ্ছ মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক 1 এর চেয়ে বেশি বলে কোন মাধ্যমে আলোর বেগ শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগের চেয়ে কম হবে।

৩. বায়ু বা শুণ্য মাধ্যমে সব রঙের আলোর বেগ সমান। কিন্তু কাচ, জল প্রভৃতির মাধ্যমে বিভিন্ন রঙের আলোর গতিবেগ বিভিন্ন হয়। এইসব মাধ্যমে লাল রঙের আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি এবং বেগুনি রঙের আলোর বেগ সবচেয়ে কম। বেগের ক্রমবর্ধমান মান অনুসারে আলোর রংগুলো যথাক্রমে বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লাল।

আলোকবর্ষ

মহাকাশে যে অসংখ্য নক্ষত্র রয়েছে তাদের পারস্পরিক দূরত্ব এত বেশি যে, কিলোমিটারে ওইসব দূরত্বকে প্রকাশ করলে প্রতিক্ষেত্রে একটি করে বিরাট আকারের সংখ্যা পাওয়া যাবে। যার ফলে ওই বিরাট সংখ্যাগুলোকে সহজে মনে রাখা সম্ভব হবে না। এইজন্য নক্ষত্রদের দূরত্ব পরিমাপ করতে জ্যোতির্বিদ্যায় আলোকবর্ষ একক ব্যবহার করা হয়।

আলোকবর্ষ সংজ্ঞা

শূন্য মাধ্যমে আলোর এক বছর সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে।

অর্থাৎ 1 আলোকবর্ষ মান = 300000×365×24×60×60 কিলোমিটার
= 9.46×1012 কিলোমিটার প্রায়।

পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র আলফা সেন্টাউরি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে প্রায় 4.4 বছর সময় লাগে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে ওই নক্ষত্রটির দূরত্ব প্রায় 4.4 আলোকবর্ষ। এছাড়া আকাশে এমন সব নক্ষত্র রয়েছে পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব বহু কোটি আলোকবর্ষ।

আলো সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

রাতে আমরা যে নক্ষত্র দেখি তাদের কোনো কোনোটির অস্তিত্ব হয়তো বহু বছর আগে লোপ পেয়েছে — ব্যাখ্যা করো।

নভোমন্ডলে এমন সব নক্ষত্র রয়েছে যাদের দূরত্ব বহু বহু কোটি আলোকবর্ষ। পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র আলফা সেন্টাউরি থেকে এই মুহূর্তে যে আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছেছে তা ওই নক্ষত্র থেকে প্রায় 4.4 বছর আগে যাত্রা করেছিল। তাই, অন্ধকার রাতে আমরা আজ যে নক্ষত্র দেখছি হয়তো তারা অনেকেই বহু বছর আগে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ধ্বংসের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ওইসব নক্ষত্র থেকে যেসব আলোক রশ্মি পৃথিবীর দিকে যাত্রা করেছিল, সেই আলোকরশ্মি গুলো পৃথিবীর দিকে এখনও আসছে বলে আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত নক্ষত্রগুলোকে আজও দেখতে পাচ্ছি।

শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ কত

শূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ 186285 কিমি/সেকেন্ড।

সূর্য ধ্বংস হওয়ার পরও আমরা কিছুক্ষণ সূর্যকে দেখতে পাবো — এর মানে কি

সূর্য ধ্বংস হওয়ার পরও আমরা সূর্যকে দেখতে পাবো; কারণ, এখন যদি সূর্য ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ধ্বংস হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে শেষ যে আলোকরশ্মি সূর্য থেকে নির্গত হবে, সেই রশ্মি পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে 8.3 মিনিট লাগবে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে সূর্য আকাশের না থাকলেও 8.3 মিনিট ধরে ওর আলো পৃথিবীতে আসবে আর আমরা সূর্যকে আকাশে দেখতে পাবো।

আলোকবর্ষ কি ? আলোকবর্ষের মান কত

জ্যোতির্বিদ্যায় কোটি কোটি মাইল দূরত্বে হিসাব করা হয়। এই বিরাট দূরত্ব মাপার জন্য একক হিসাবে আলোকবর্ষ ব্যবহৃত হয়। শূন্য মাধ্যমে আলোর এক বছর সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলা হয়।
আলোকবর্ষের মান
এক আলোকবর্ষ = 186000×60×60×24×365 মাইল
= 5.86×1012 মাইল প্রায়
= 9.46×1012 কিলোমিটার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here