Home ইতিহাস সম্রাট হিমু (হেমচন্দ্র) | দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ – গুরুত্ব

সম্রাট হিমু (হেমচন্দ্র) | দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ – গুরুত্ব

by CompleteGyan
সম্রাট হিমু

সম্রাট হিমু (হেমচন্দ্র) | দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ – গুরুত্ব

সম্রাট হিমু (হেমচন্দ্র) , দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ এবং‌ দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব জানার আগে আমদের জেনে রাখা প্রয়োজন যে, মধ্যযুগে ভারতের ভাগ্য যাদের হাতে নিয়ন্ত্রিত হতো তারা এ দেশের প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি। ইতিহাসকে বিকৃত করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য। কিন্তু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের ইতিহাসবিদেরা যেসব ভারতীয় রাজা মাতৃভূমিকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাদের কথা চেপে গিয়ে অ উপেক্ষা করে সেই বিকৃতিকেই আরও পুষ্ট করেছেন। আমরা জেনেছি পৃথ্বীরাজ চৌহান ছিলেন দিল্লির শেষ হিন্দু শাসক। এও জেনেছি মুঘলদের সুদীর্ঘ শাসনকালে কোন হিন্দু সম্রাট মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দিল্লিকে মুক্ত করতে পারেননি।

অথচ হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য সংক্ষেপে হিমু মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধে জয়লাভ করে দিল্লিকে মুঘল কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং সর্বোপরি অল্প দিনের জন্য হলেও সম্রাট হয়েছিলেন। ভাগ্য হিমুর সহায় হলে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ এ ভারতের ইতিহাসের “পোস্টার বয়” আকবরকে ডাহা হারাতে হতো।

সম্রাট হিমুর প্রাথমিক জীবন

সম্ভবত ভারতের সব থেকে জটিল এবং সংঘাতময় সময়ে হিমুর জন্ম হয় (১৫০১-১৫৫৬)। এই সময়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা ভারতের পরবর্তী আড়াইশো বছরের ইতিহাসের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিয়েছিল। হিমুর ছেলেবেলা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু তথ্য জানা যায় না। বস্তুত ভারতীয় ইতিহাসবিদেরা হিমুর জন্মস্থান এবং ছেলেবেলার নাম নিয়েই দ্বিধান্বিত। কে কে ভরদ্বাজের মতে তার আসল নাম সম্ভবত বসন্তরাই কিংবা হেমরাই বা হেমরাজ অথবা হেমচন্দ্র ভার্গব বা হিমু। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন “ধনসার সম্প্রদায়ের কোনো এক দরিদ্র পরিবারে হিমুর জন্ম। থাকতেন আলওয়ারের দক্ষিনে এক ছোট শহরে”। মুসলমান ঐতিহাসিক বদায়ুনি লিখেছেন, হিমু ছিলেন মেওয়াট তালুকের অন্তর্গত রিওয়ারি শহরের বাসিন্দা সবজি বিক্রেতা হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন হিমু। একই সঙ্গে ধার্মিক এবং সাত্ত্বিক পরিবেশে বড় হবার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। শিখেছিলেন অনেকগুলো ভাষা। তার মধ্যে ছিল সংস্কৃত, পারসি এবং আরবি ভালো পাটিগনিত‌ও জানতেন। এছাড়া ছিল অশ্বারোহণ এবং কুস্তির শখ।

১৫৩০ সালে হিমু শেরশাহ সুরির কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর সংস্পর্শে আসেন। এরপরই শুরু হয় তার জয়যাত্রা। ১৬শ শতকের ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল আফগানদের দখলে ছিল। রাজপুতানা, উড়িষ্যা, অসম আর দক্ষিণ ভারতের বিজয় নগর শুধু ছিল। স্বাধীন দিল্লিতে তখন সুলতান ইব্রাহিম লোদীর শাসন উত্তর ভারতের প্রায় পুরোটাই তার দখলে। এই সময়, ১৫২৬ সালে বাবর নামে মধ্য এশিয়ার এক যোদ্ধা সসৈন্যে ভারত আক্রমণ করে। কাবুল থেকে পাঞ্জাব হয়ে বাবর সরাসরি দিল্লি পৌঁছে যায়। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ২১ এপ্রিল, ১৫২৬ বাবর ইব্রাহিম লোদীকে গোয়ালিয়র-রাজ রাজা বিক্রমাদিত্যের যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করে। এর কিছুদিন পর রানা সংগ্রাম সিংহের নেতৃত্বে রাজপুত্র বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। রাজপুতদের সহযোগী হয়েছিল হাসান খান মোয়ে। ‌ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই যুদ্ধেও হিন্দু- আফগান যৌথ বাহিনী পরাজিত হয়।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানরা কেন হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। হিন্দুরাই বা কিসের ভিত্তিতে ধর্মীয় বিভেদ উপেক্ষা করে আফগানদের বিশ্বাস করেছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কাবুল-কান্দাহার অঞ্চল গান্ধার নামে পরিচিত ছিল। সেই সময় থেকেই গান্ধার ভারতীয় সভ্যতার অঙ্গবিশেষ। পরবর্তীকালে আরব সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহতার কাছে নতি স্বীকার করে গান্ধারবাসীরা ধর্ম ত্যাগ করলেও হিন্দুদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তা ক্ষুন্ন হয়নি। তাই বহিরাগত দখলদার মুঘলদের তুলনায় আফগানরা ছিল হিন্দুদের অপেক্ষাকৃত কাছের। আবার মোঘলদের কাছে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আফগানদের হিন্দুর সাহায্য নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না।

যাই হোক, বাবরের মৃত্যুর পর তার ছেলে হুমায়ুন সম্রাট হলেন। এ সময় বিহারের শাসনকর্তা ছিলেন এক আফগান- শেরখান। তিনি হুমায়ূনকে আক্রমণ করেছিলেন। যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে হুমায়ুন দিল্লি ছেড়ে পালিয়ে যান। সিংহাসনে বসেন শেরশাহ। বাদশাহ্ হবার পর তার নাম হয় শেরশাহ সুরি।

হেমচন্দ্রের (হিমু) উত্থান


হেমচন্দ্রের উত্থান হয় এই সময়। তিনি তখন দিল্লি থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে থাকেন। শেরশাহের সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্য জোগান দেন। ধীরে ধীরে তিনি বারুদের মশলাও বিক্রি শুরু করলেন। একদিন শেরশাহের ছেলে ইসমাইল শাহের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। ১৫৪৫ সালে শেরশাহের মৃত্যুর পর ইসমাইল শাহ তখন তার উত্তরাধিকারী। হেমচন্দ্রের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রতিভার পরিচয় পেয়ে ইসমাইল শাহ তাকে শাহাঞ্জ-ই-বাজার পদে নিয়োগ করেন। পারসি কথাটির বাংলা অর্থ বাজার সরকার। সমগ্র সাম্রাজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা কাটার দায়িত্ব তার ওপর। বাজার সরকার হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার পর হেমচন্দ্রের পদোন্নতি ঘটল দারোগা-ই- চৌকি পদে। যার অর্থ গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান। ইসমাইল শাহের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। এর কতকটা স্বাস্থ্যের কারণে তিনি রাজধানী দিল্লি থেকে গোয়ালিয়রে স্থানান্তরিত করেন। এর কিছুদিন পর তিনি হেমচন্দ্রকে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেন।১৫৫৩ সালে ইসমাইল শাহের মৃত্যু পর্যন্ত হেমচন্দ্র ওই পদে ছিলেন।


ইসমাইল শাহ এর মৃত্যুর পর তার ১২ বছরের ভাইপো ফিরোজকে খুন করে আদিল শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে তিনি ছিলেন অযোগ্য। শাসনভার হাতে নিয়েই তিনি হেমচন্দ্রকে ওয়াজির অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। যাইহোক, ফিরোজের হত্যা এবং আদিল শাহের ক্রমাগত প্রশাসনিক ব্যর্থতায় বিরক্ত আফগান সর্দারেরা শীঘ্রই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আদিল শাহের সাম্রাজ্য চার টুকরো হয়ে যায়। সিকান্দার সুরি নিজেকে পাঞ্জাবের সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে। দিল্লি ও আগ্রা দখল করে ইসলাইন সুরি। বাংলা যায় মোহাম্মদ সুরির দখলে। আদিল শাহের অধিকারে থাকে শুধু বিহার। এছাড়া আরো অনেক আফগান শাসক বিদ্রোহ করে। এইসময় হেমচন্দ্র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের যোগ্যতা সবদিক থেকে প্রমাণ করেছিলেন। অজস্র যুদ্ধে তিনি প্রায় প্রতিটি বিদ্রোহী আফগানকে শায়েস্তা করেন। মহম্মদ সুরি যুদ্ধে নিহত হন। ইব্রাহিম শাহ সুরি দুবার পরাস্ত হন। এতগুলো যুদ্ধ জিতে হেমচন্দ্র শুধু যে সাম্রাজ্য এবং তার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ রক্ষা করেছিলেন তাই নয়, আফগান সেনা বাহিনী তার সম্পূর্ণ বশীভূত হয়েছিল।

হিমুর রাজ্যাভিষেক


ইতিমধ্যে আফগান শাসকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর হুমায়ুনের কানে পৌঁছেছিল। শেরশাহের কাছে পরাজিত হবার ১৫ বছর পর তিনি পারস্য সম্রাটের সহযোগিতায় ভারতে ফিরে সিকান্দার সুরিকে যুদ্ধে পরাজিত করে দিল্লি দখল করেন। সেটা ১৫৫৫ সাল। সাম্রাজ্যের ভিত শক্ত হবার আগেই ১৫৫৬ সালে হুমায়ূনের মৃত্যু হয়। হেমচন্দ্র তখন বাংলায় ছিলেন। হুমায়ূনের মৃত্যু তার সামনে অভাবনীয় একটা সুযোগ এনে দিল। ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ হয়ে দিল্লির দিকে রওনা দিলেন। সেই সময় হেমচন্দ্রের যুদ্ধ পরিচালনা ও কৌশলের খ্যাতি এমনই ছিল যে স্রেফ ‘হিমু আসছে’ এই ভয়ে একাধিক মুঘল সেনাপতি এবং অজস্র সাধারন ‌সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। হেমচন্দ্রের সেনাবাহিনী প্রায় বিনা বাধায় আগ্রায় প্রবেশ করে। চোখের পলকে শত্রু শিবির ধ্বংস করে হেমচন্দ্র আরো একবার তার হিন্দু আফগান বাহিনীর সম্মান আদায় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার আর কোন অযোগ্য শাসকের রবার স্টাম্প হবার ইচ্ছে তার ছিল না, তিনি নিজেই দিল্লির সম্রাট হতে চাইলেন। সেনাপতিরা সানন্দে তাতে সম্মতি দিল।

ওদিকে, হুমায়ুনের বালক পুত্র জালালউদ্দিন আকবরের অভিভাবক এবং মোঘল সেনাপতি বৈরাম খাঁ উপস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে দিল্লির তৎকালীন শাসক তারদিবেগ খানের সঙ্গে একযোগে হেমচন্দ্রকে আক্রমণ করল।


যুদ্ধ হয়েছিল এখনকার তুঘলকাবাদে। সেই যুদ্ধে হেমচন্দ্র ৩০০ হাতেই ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু তার সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগ ততটা সুসংগঠিত ছিল না। ফলে মোঘলরা ওয়াল প্রচেষ্টায় ব্যুহ ভেদ করে ঢুকে পড়ে। প্রায় ৩০০০ আফগান সৈন্য এবং শতাধিক হাতে নিহত হয়। জয় অনুমান করে মুঘল সৈন্যরা যখন শত্রু শিবির এর একাংশ ধ্বংস করতে ব্যস্ত ঠিক সেইসময় হেমচন্দ্র নিজে কয়েকজন বাছাই করা সৈন্য নিয়ে সরাসরি তারদিবেগ খানের দিকে অগ্রসর হন। সম্পূর্ণ অরক্ষিত তারদিবেগ খানকে ভূলণ্ঠিত হোতে দেখে মুঘল সৈন্যরা ভঙ্গ হয়ে পড়ে।

উলসে হেগ লিখেছেন ‘দিল্লি জয় করার পর হেমচন্দ্র এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে তার মনে হয়েছিল জীবনের সব আকাঙ্ক্ষা পুরনো হয়ে গেছে।’ ভিন্সেন্ট স্মিথ বলেছেন “সেই সময় হিন্দুস্তানের সম্রাট হওয়ার যোগ্যতা ৩ জনের ছিল। সুরিদের বাদ দিলে আকবর আর হেমচন্দ্রের।” ১৫৫৬ সালের ৭ই অক্টোবর আফগান সর্দার এবং হিন্দু সেনাপতিদের উপস্থিতিতে হেমচন্দ্রের রাজ্যভিষেক হয়। কে কে ভরতদ্বাজ লিখেছেন অভিষেক অনুষ্ঠানে হাজার হাজার অতিথি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ছিলেন রাজপুত এবং আফগান সর্দারেরা এবং অসংখ্য পন্ডিত ও সাধারণ মানুষ। চারদিন ধরে উৎসব হয়েছিল।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার লিখেছেন হিন্দু রাজার অভিষেকে যা আবশ্যিক তার সবই হয়েছিল। হেমচন্দ্র কে দুধে স্নান করানো থেকে শুরু করে রাজছত্র ধারণ– কিছুই বাদ পড়েনি। রীতি মেনে হেমচন্দ্র পুরোহিতদের পত্র প্রদান করেন এবং আমলাতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করতে বেশকিছু নিয়োগ করেন। হেমচন্দ্রের ভাই যুঝারু রাইকে আজমিরের শাসন ভার অর্পণ করা হয়। ভাইপো রা মায়া পান সেনাপ্রধানের পদ পান। এছাড়া হেমচন্দ্র তার সমর্থকদের যোগ্যতা অনুযায়ী চৌধুরী এবং মোকদ্দমের পদ প্রদান করেন।

তিনশো পঞ্চাশ বছর পর হেমচন্দ্রের মাধ্যমে উত্তর ভারতে একজন ভারতীয় সম্রাট পেয়েছিল। আবুল ফজল তার আকবরনামা গ্রন্থের লিখেছেন, দিল্লি জয়ের পর হিমু কাবুল কান্দাহার জয়ের ও পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীতে আফগানদের পাশাপাশি ভারতীয়দের আরো বেশি সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ

দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ হওয়ার কারন ছিল এরকম – – – হেমচন্দ্রের দিল্লি জয় এবং রাজ্যভিষেক মুঘলদের চিন্তায় ফেলে দিল। মোগল সেনাপতিরা আকবরকে কাবুলে চলে গিয়ে হুমায়ুনের মতো উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ তখনই হেমচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ চাইছিলেন। তিনি জানতেন যুদ্ধে মুঘলদের পরাজয় হতে পারে। তাই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আট মাইল দূরে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যাতে বাহিনী পরাজিত হলে সময়মতো কাবুলে পালাতে পারেন।

১৫৫৬ সালের ৫ই নভেম্বর হেমচন্দ্র আর মুঘলদের মধ্যে ঐতিহাসিক দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ শুরু হলো। এই সেই পানিপথ, ৩০ বছর আগে যেখানে আকবরের পিতামহ বাবর ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করেছিলেন। নিজেদের রণকৌশল এবং বাহিনীর শৌর্যবীর্যের উপর ভরসা রাখতে না পেরে বৈরাম খাঁ ইসলামের দোহাই দিয়ে সৈন্যদের উত্তেজিত করেছিলেন। এদিকে সম্রাট হিমু তার প্রধান সেনাপতিদের রাজধানীর প্রহরায় রেখে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হলেন। পরবর্তীকালে অনেক ঐতিহাসিক হিমুর এই সিদ্ধান্তকে চরম ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। যাই হোক যুদ্ধ শুরু হলো। হেমচন্দ্র হাতির পিঠে বসে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন।

সবকিছুই ঘর ছিল তার অনুকূলে। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ছিলনা। হঠাৎই কোথা থেকে একটা তীরে সে তার চোখে লাগে। অসম সাহসী হিমু চোখ থেকে তীর বের করে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু বিপুল রক্ত ক্ষরণের জন্য দুর্বল হিমু কিছুক্ষণের মধ্যে অচৈতন্য হয়ে পড়েন। মুহুর্তের মধ্যে বদলে যায় দৃশ্যপট। সম্রাটকে এইভাবে লুটিয়ে পড়ছে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় সৈন্যরা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে যায়। প্রধান সেনাপতিরা সকলে রাজধানীতে থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রে এমন কেউ ছিলো না যিনি এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফল যা হবার তাই হয়ে ছিল। যে যুদ্ধ সহজেই জেতা যেত তা বিশ্রীভাবে হেরে গেলেন হেমচন্দ্র। অচৈতন্য মৃতপ্রায় হিমুকে শাহকুলি খান টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল আকবরের শিবিরে। সেখানে বৈরাম খাঁ তার শিরশ্ছেদ করেন।

হেমচন্দ্রের ছিন্ন মস্তক আবুলের দিল্লি দরওয়াজার সামনে তিন দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। শরীর দাহ করা হয় পুরনো কেল্লায়। ঠিক সেখানে যেখানে হেমচন্দ্রের রাজ্য অভিষেক হয়েছিল। এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই হেমচন্দ্রের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেইসঙ্গে খুন করা হয় হেমচন্দ্রের আফগান ও ভারতীয় সমর্থকসহ অসংখ্য নিরীহ নর-নারীকে। হেমচন্দ্রের অনুগামীদের হাড় দিয়ে মসজিদের গম্বুজ বানানো হয়েছিল।এখনো এরকম একটি গম্বুজের ছবি পানিপথের জাদুঘরে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে। হেমচন্দ্রের মৃত্যুর ৬০ বছর পর জাহাঙ্গীরের আমলে ব্রিটিশ পর্যটক পিটার মান্ডি ভারতে এসে মানুষের হাড়ের তৈরি গম্বুজ দেখেছিলেন। দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ এভাবেই শেষ হয়। দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ কে দেখে মনে হয় দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব খুব বেশি নয় কিন্তু এটি ভারতের ভাগ্য ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব

দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব ছিল ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকদের মধ্যে কেউ কেউ হেমচন্দ্রের পরাজয়ও অকাল মৃত্যুতে ভাগ্য বিপর্যয় বলে উল্লেখ করেছেন। বস্তুত এটা শুধু হেমচন্দ্রের নয় সমগ্র ভারতের ভাগ্য বিপর্যয়। বিশেষ করে যখন দেখা যায় তিনশো পঞ্চাশ বছর ধরেই ইসলামী সন্ত্রাসের আছে সেতো হওয়ার পর উত্তর ভারতের মানুষ হেমচন্দ্রের মধ্যে রূপকথার নোয়াকে দেখেছিলেন। আশা করেছিলেন ওয়াতার নৌকায় সবাইকে তুলে নিয়ে বর্বর বিধর্মীর অত্যাচার থেকে তাদের মুক্তি দেবেন। কিন্তু সামান্য এর জন্য তা হয়নি। এরপর মুঘলরা ভারতে আরো জাঁকিয়ে বসলো। ১৭০৯ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের উচ্ছেদ করার কথা ভাবা যায়নি। ১৭৩৭ সালে মারাঠাদের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দিল্লি দখল করল। মুক্তি পেল উত্তর ভারত। দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হেমচন্দ্র হেরেছিলেন ঠিকই কিন্তু তাই বলে তার বিরুদ্ধে প্রয়াসকে কখনো ছোট করে দেখা যায় না। ঐতিহাসিক কে কে ভরতদ্বাজ হিমুকে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। দুজনেই দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। দুজনেই জিতেছেন একের পর এক যুদ্ধ। দুজনেই নিজেদের প্রতিভা পরিশ্রম ও বীরত্বকে ভিত্তি করে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছে। আবারো দুজনেই জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে হেরেও গিয়েছেন। দুজনের মিল যেমন আছে তেমনি অমিলও আছে। ফ্রান্সে তো বটেই বলতে গেলে সারা পৃথিবীতেই নেপোলিয়ন শ্রদ্ধা ও সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে হতভাগ্য হেমচন্দ্র কে তার নিজের দেশি মনে রাখেনি। এ যে কত বড় লজ্জা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতীয়দের এই আত্মঘাতী মানসিকতার দ্রুত অবসান প্রয়োজন। ইতিহাস বিমুখ হওয়ার অর্থ নিজের মেরুদন্ড টিকে বন্ধক রাখা। আর এ কথা কে না জানে অমেরুদন্ডী প্রাণীদের পক্ষের জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া শুধু কঠিন নয় এক কথায় অসম্ভব। এভাবেই দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।

ইমেজ সোর্স haribhakt

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

You may also like

Leave a Comment