Home পদার্থ বিজ্ঞান ভর এবং ভার। ভর ও ভারের পার্থক্য

ভর এবং ভার। ভর ও ভারের পার্থক্য

by CompleteGyan
ভর ও ভার

ভর এবং ভার আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। কিন্তু ভর এবং ভার সম্বন্ধে আমাদের মধ্যে ধারণা কখনো কখনো স্পষ্ট করতে পারিনা। কিংবা কখনো কখনো আমরা কনফিউজড হয়ে যাই কোনটি ভর এবং কোনটা ভার। তো আমরা এই আর্টিকেল থেকে আজকে চাই সঠিক ধারণা নিতে।

ভর

  • সংজ্ঞা ঃ বস্তুর ভর বলতে ঐ বস্তুর মধ্যে কতটা জড় পদার্থ আছে তা বোঝায় অর্থাৎ কোন বস্তুর মধ্যে যে পরিমাণ জড় পদার্থ থাকে তাকেই বস্তুতির ভর বলে।
  • বস্তুর ভর সাধারণত ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করা যায়।
  • এর অভিমুখ নেই।
  • বস্তুকে যেকোন স্থানে নিয়ে গেলেও বস্তুর ভরের কোন পরিবর্তন হয় না।
  • সাধারন তুলা যন্ত্রের সাহায্যে ভরের পরিমাপ করা হয়।

ভরের অবিনাশিতাবাদ বা নিত্যতা সূত্র ঃ


পদার্থের নিত্যতা সূত্রটি আবিষ্কার করেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ে। রাসায়নিক বিক্রিয়া গুলির বিভিন্ন ঘটনা পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণ করে তিনি সিদ্ধান্ত করেন পদার্থ অবিনশ্বর এর সৃষ্টি কিংবা বিনাশ নেই।
সূত্রঃ যে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায়, বিক্রিয়ার আগে বিকারক পদার্থের মোট ভর ক্রিয়ার শেষে বিক্রিয়াজাত পদার্থের মোট ভরের সমান। অন্যভাবে বলা যায় পদার্থ অবিনশ্বর পদার্থকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না । বিভিন্ন ভৌত প্রক্রিয়ায় পদার্থের অবস্থান্তর ঘটে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য পদার্থের রূপান্তরিত হয়।

  • কয়েকটি ঘটনা দেখে আমাদের মনে হতে পারে যে ভরের নিত্যতা সূত্র টি ভুল।
  • যেমন মোমবাতি জ্বলে শেষ হয়ে যায় কাগজ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কাগজের ওজন কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই ঘটনাগুলো কি ভরের ধ্বংস নির্দেশ করে?
  • একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মোমবাতি বা কাগজ জ্বলার সময় বাতাসের অক্সিজেন এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং জল উৎপন্ন করে। যেগুলি উৎপন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়। উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং জল এর ওজন নেওয়া সম্ভব হলে দেখা যেত মোমবাতি এবং ওর সঙ্গে যুক্ত অক্সিজেন এর মোট ওজন কিংবা কাগজ এবং যুক্ত অক্সিজেন এর ওজন ওদের দ্বারা উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং জল এর মোট ওজনের সমান হচ্ছে।।
  • কর্পূর কে খোলা বাতাসে রাখলে ওজন কমে যায়। কর্পূর সাধারণ উষ্ণতায় বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যায়। এই কর্পূর বাষ্পকে ধরে ওজন নিলে দেখা যাবে যে বাষ্পের ওজন ওই কর্পূর এর কমে যাওয়া ওজনের সমান।

ভার বা ওজন


সংজ্ঞা ঃ একটি বই কে টেবিল থেকে কিছুটা উপরে তুলে ছেড়ে দিলে আবার টেবিলের উপর গিয়ে পড়ে।এর দ্বারা বোঝা যায় যে পৃথিবী সব বস্তুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে। একেই অভিকর্ষ বলে। এই অভিকর্ষের জন্য কোন বস্তুকে হাতের উপর রাখলে আমরা নিম্ন অভিমুখী এক বল অনুভব করি। এই নিম্নমুখী বলি হলো বস্তুটির ভার বা ওজন।
যে বল দ্বারা পৃথিবী কোন বস্তুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে তাকেই ঐ বস্তুর ভার বা ওজন বলে।

var ba ojon
  • ভার হল একটি বল।
  • এর অভিমুখ আছে। তাই এটি একটি ভেক্টর রাশি।
  • নিউটনের গতিসূত্র বলে যে, বল = ভর×ত্বরণ; এখানে ত্বরণ হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ।
  • এখন বস্তুর ভর =m। ভার =w এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ= g হলে w=mg অর্থাৎ ভার বা ওজন =বস্তুর ভর × অভিকর্ষজ ত্বরণ।
  • বস্তুর ভর এবং ভার এক জিনিস নয়। কোন স্থানে বস্তুর ভার বা ওজন বস্তুটির ভর এবং ওই স্থানের g এর সমানুপাতিক হয়। অর্থাৎ যে বস্তুর ভর বেশি এবং তার ওপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল অর্থাৎ বস্তুটির ভার ততবেশি। ভর কম হলে বস্তুটির ভার কম হবে। কোন স্থানে g এর মান বেশি হলে বস্তুটির ভারও বেশি হবে।

বস্তুর ভার অর্থাৎ ওজন পরিবর্তনশীল

  • বস্তুর ভরের পরিবর্তন হয় না কিন্তু ভূপৃষ্ঠের উপর বিভিন্ন জায়গায় অভিকর্ষজ ত্বরণ g এর মান বিভিন্ন হয়।
  • এর কারণ হলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠের উপরে থাকা বস্তুটির দূরত্ব বেশি হলে অভিকর্ষজ ত্বরণ g এর মান কমে যায়। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠের উপরে থাকা বস্তুটির দূরত্ব কম হলে অভিকর্ষজ ত্বরণ g এর মান বেড়ে যায়।
  • পৃথিবী সম্পূর্ণ গোলাকার নয়। মেরু কিছুটা চাপা এবং নিরক্ষীয় অঞ্চল কিছুটা স্ফীত।
  • তাই পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে নিরক্ষরেখার দূরত্ব মেরুদণ্ডের দূরত্বের চেয়ে বেশি। সেই কারণে পৃথিবীর নিরক্ষরেখার g এর মান কম হয় ফলে ওই অঞ্চলে কোন বস্তুর ওজন কম হবে। আবার ওই অঞ্চলে কোন উঁচু পাহাড়ের চূড়ার দূরত্ব পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে আরও বেশি তাই g এর মান আরো কম হবে সুতরাং পাহাড়ের চূড়ার বস্তুর ওজন আরো কম হয়ে যাবে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দূরত্ব পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে কম হওয়ার জন্য মেরু দুটিতে g এর মান বেশি হয়। ফলে ওই বস্তুটিকে মেরুতে নিয়ে গেলে দেখা যাবে বস্তুর ওজন বেশি হচ্ছে।
  • ভূপৃষ্ঠের যত নিচে যাওয়া যায় পৃথিবীর অভিকর্ষ বল তত কমে যায়। তাই কোন বস্তুর ওজন ভূপৃষ্ঠের উপর যা হবে গভীর খনির মধ্যে বস্তুর ওজন কমে যাবে।
  • পৃথিবীর কেন্দ্রে কোন আকর্ষণ বল নেই, তাই বস্তুটিকে পৃথিবীর কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে দেখা যেত যে ওখানে বস্তুটি ভর হয়ে গেছে। অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্রে কোন বস্তুর ভর শূন্য হয়ে যায়।
  • সূর্য এবং চন্দ্র বিভিন্ন গ্রহের অভিকর্ষ বিভিন্ন কারও পৃথিবীর আকর্ষণ এর চেয়ে বেশি আবার কারো পৃথিবীর আকর্ষণ হচ্ছে কম। কোন বস্তু সূর্যের নিয়ে গেলে তার ওজন অনেক বেড়ে যাবে। বৃহস্পতি গ্রহের অভিকর্ষ পৃথিবীর চেয়ে বেশি আবার বুধের অভিকর্ষ পৃথিবীর চেয়ে কম।
  • চাঁদের অভিকর্ষ পৃথিবীর অভিকর্ষ চেয়ে অনেক কম পৃথিবীর আকর্ষণ বলের প্রায় 1/6 অংশ। সেই জন্য চাঁদে বস্তুর ওজন অনেক কমে যাবে। তাই দেখা যায় চাঁদের অভিযাত্রীরা ভারী পোশাক এবং যন্ত্রপাতি নিয়েও চাঁদের মধ্যে সহজেই চলাফেরা করতে পারে। ভূপৃষ্ঠে এটা করা সম্ভব হতো না।

ভর এবং ভারের মধ্যে পার্থক্য

ভর এবং ওজন বা ভার এর মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। কিন্তু আমরা প্রায়শই ভারকে ভর এবং ভরকে ওজন বা ভার এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি এবং বর্ণনা দিই। এই ধরা যাক একজন মানুষের ভর ৬০ কিলোগ্রাম কিন্তু আমরা অনায়াসেই জিজ্ঞাসা করে ফেলি আপনার ওজন কত। কিন্তু ওজন ৬০ কিলোগ্রামের সঙ্গে পৃথিবীর অভিকর্ষ ত্বরন গুন করলে তবেই পাওয়া যায়। তো আমরা নিচে ভর এবং ভারের পার্থক্যকে সঠিকভাবে নির্ণয় করতে শিখব।

  • বস্তুর ভর বলতে ওই বস্তুটির মধ্যে কতটা জড়পদার্থ আছে তা বোঝায়,আর ওজন হলো একটি বলঃ যে বল দ্বারা পৃথিবী বস্তুটিকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে।
  • সিজিএস পদ্ধতিতে ভরের একক হল গ্রাম এবং এফপিএস পদ্ধতিতে পাউন্ড কিন্তু ওজন বা ভারের একক যথাক্রমে ডাইন এবং পাউন্ডাল।
  • কোন বস্তুর ভর সব জায়গায় একই থাকে ভরের পরিবর্তন হয় না। বস্তুর ভার কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হয়।
  • ভরের পরিমাণ আছে কিন্তু কোন অভিমুখ নেই এটি একটি স্কেলার রাশি। কিন্তু ভার বা ওজন এর পরিমাণ এবং অভিমুখ দুইই আছে এটি একটি ভেক্টর রাশি।
  • ভর হলো বস্তুর নিজস্ব মৌলিক ধর্ম। এই ধর্মের জন্য কোন বস্তুর ভর সর্বত্র অপরিবর্তিত থাকে। বস্তুর গতি স্থিতি উষ্ণতা প্রভৃতি কোনকিছুই বস্তুর ভর বদলাতে পারে না। বস্তুর ভর সর্বদা একই থাকে। তাই ভর হলো বস্তুর অপরিহার্য স্বকীয় ধর্ম। ভার বা ওজন এর মান পরিবর্তনশীল কারণ বিভিন্ন স্থানে একই বস্তুর ভার বিভিন্ন হয়। পৃথিবীর কেন্দ্রে বস্তুর ভার শূন্য হয়ে যায়। কোন কারণে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল লোপ পেলে বস্তুর ভরের কোন পরিবর্তন হবে না কিন্তু বস্তুর ওজন শূন্য হয়ে যাবে অর্থাৎ বস্তুটি ভারহীন হবে। তাই বস্তুর ভার বস্তুটির নিজস্ব কোন স্বকীয় বা মৌলিক ধর্ম নয়।
  • বস্তুর ভর মাপা হয় সাধারণ তুলা যন্ত্রের সাহায্যে কিন্তু বস্তুর ভার মাপা হয় স্প্রিং তুলা যন্ত্রের সাহায্যে।
  • এস আই পদ্ধতিতে ভরের একক কিলোগ্রাম কিন্তু যেহেতু বলের একক নিউটন এবং ওজন নির্ভর করে অভিকর্ষজ বল এর উপরে তাই এর এককও নিউটন।
  • ভরকে ইংরেজি অক্ষর m দ্বারা প্রকাশ করা হয় কিন্তু ওজনকে mg দিয়ে প্রকাশ করা হয় (এখানে g পৃথিবীপৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ)।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

You may also like

Leave a Comment

Adblock Detected!

Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.