ব্যাংকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস | ব্যাংকের ধারণা

1
351

১.১ ভূমিকা।

আজকের দিনে ব্যাংক হলাে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। তাই কোনাে ব্যাংক কতটা সেবা প্রদান করতে পারছে তার ওপরই ব্যাংকের সাফল্য নির্ভরশীল। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, কর্মীদের ব্যবহার, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, কম সময়ে কার্য সম্পাদন, দ্রুত ঋণ মঞ্জুর, বিভিন্নমুখী সেবা প্রদান এ নিয়ে আজ প্রতিযােগিতা চলছে সর্বত্রই । আমাদের মতাে দেশে বেসরকারি ব্যাংকগুলাে এক্ষেত্রে কিভাবে প্রতিযােগিতা করছে তা একটু খোঁজ-খবর নিলেই চোখে পড়ে। এই আলোচনা পর্বে ব্যাংকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস সন্ধে জানবো।

Introduction সভ্য সমাজে অর্থ ছাড়া যেমনি কোনাে মানুষের পক্ষে চলা সম্ভব নয় তেমনি ব্যাংক ছাড়াও অর্থের কার্যকর ব্যবহার, লেনদেন ও নিরাপত্তা বিধান অসম্ভব। শুধুমাত্র শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদেরকেই নয়, সমাজের সব ধরনের মানুষকেই ব্যাংক আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। তাই একজন ছাত্রকেও ব্যাংকে হিসাব খুলে লেনদেন করতে দেখা যায় । যেখানেই অর্থ সেখানেই ব্যাংক বা যেখানে ব্যাংক সেখানেই অর্থ এভাবে অর্থ ও ব্যাংক আজকের সমাজে যেন সমার্থক হয়ে পড়েছে। 

 ব্যাংকিং ও বিমা : তত্ত্ব, আইন ও হিসাব ‘ব্যাংক পরের ধনে পােদ্দারি করে’–এ আপ্তবাক্য সব সমাজেই প্রচলিত। বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে জনগণের অর্থ । জমা হিসাবে সংগ্রহ করা ব্যাংকের প্রধান কাজ। যে ব্যাংক যত বেশি আমানত সংগ্রহ করতে পারে তার পক্ষেই তত বেশি সফলতা অর্জন সম্ভব বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে ঋণ প্রদান ব্যাংকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই ঋণ। যথাযথ খাতে এবং যােগ্য ও সৎ লােকদেরকে প্রদান ও যথাসময়ে সংগ্রহ করতে পারাও ব্যাংকের সাফল্যের অন্যতম। নিয়ামক। কম সুদে বা লাভে আমানত সংগ্রহ ও বেশি সুদে বা লাভে তা ঋণদানের মধ্যবর্তী পার্থক্যই হলাে ব্যাংকের আয়ের প্রধান উৎস।

আমানত সংগ্রহ ও ঋণদানের মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবসায়ের উৎপত্তি ঘটলেও বর্তমানকালে এর কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। মানুষের আর্থিক কর্মকাণ্ডের গতি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন সাধিত হওয়ায় জনগণের প্রয়ােজন। পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। আমানত সংগ্রহ ও ঋণদানের সাথে মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাে জড়িত থাকলেও বিনিয়ােগ ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক, বিনিময় ব্যাংক, শিল্প ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত ব্যাংক গড়ে উঠায় ব্যাংকের গতি প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসছে। তাই ব্যাংক ব্যবস্থার ক্রম বিবর্তনের ধারায় ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য, কার্যক্রম, মূলনীতিসহ ব্যাংকিং কার্যক্রমে এবং গ্রাহক সম্পর্কে ভবিষ্যতে আরাে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

১.২ ব্যাংকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস

Origin & Historical Evolution of Bank মুদ্রার প্রচলন এবং আধুনিক নােট ও মুদ্রার পর্যায়ে তা উন্নয়নের মতােই ব্যাংক ব্যবসায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস অনেক পুরনাে। কখন থেকে ব্যাংক ব্যবসায়ের উৎপত্তি ঘটেছে তার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও মুদ্রার প্রচলনের পর ব্যাংক ব্যবসায়ের উদ্ভব ঘটেছে তা নির্দ্বিধায় বলা চলে। ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের সাথে অর্থের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থার প্রয়ােজন সকল সমাজেই তীব্র হয়েছে।

মুদ্রার প্রচলন সহজ হলেও ব্যাংক ব্যবসায়ের উন্নয়নের ইতিহাস ছিল অনেক ধীর ও ক্রমবিবর্তনশীল। একদল মানুষের অর্থের নিরাপত্তার প্রয়ােজনীয়তা এবং অন্য আরেকদল মানুষের ঋণের আবশ্যকতা এই বিপরীতধর্মী দু’টি অবস্থার মধ্য দিয়ে ব্যাংক ব্যবসায়ের প্রধান দুটি কাজ আমানত সংরক্ষণ ও ঋণদান প্রথার উদ্ভব ঘটে। অর্থের নিরাপত্তার প্রয়ােজনে মানুষ কখনও উপাসনালয়ের পুরােহিত, কখনও স্বর্ণকার, ব্যবসায়ী বা অন্যদের শরণাপন্ন হয়েছে। আবার ঋণের প্রয়ােজনে মানুষ দ্বারস্থ হয়েছে মহাজন শ্রেণির । সভ্যতার বিবর্তনে যখন এ দ্বিমুখী কাজ একই। ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদন শুরু হয়েছে তখনই কার্যত উৎপত্তি ঘটেছে ব্যাংকের। সেই ব্যাংক প্রথমত এতটা সংঘটিত না। হলেও কালের বিবর্তনে প্রয়ােজনের সাথে সম্পর্ক রেখে তা হয়েছে অনেক সংগঠিত ও শক্তিশালী। যার অবশ্যম্ভাবী। রূপই হলাে আজকের আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা।

নিমে ব্যাংকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলাে :

১. মুদ্রার প্রচলন ও ব্যাংক (Introduction of money and bank) :

বিনিময় প্রথার অসুবিধা দূর করার জন্য বিমিয়ের মাধ্যম হিসেবে মূদ্রার প্রচলন ঘটে। আর মূদ্রার প্রচলনের পর ব্যাংক ব্যবসায়ের সূত্রপাত হয়। অর্থনীতিবিদ হানা -এর মতে, “মুদ্রার প্রয়ােজনেই এসেছে ব্যাংক” । এজন্যই বলা হয় Money is the mother of bank’ অর্থাৎ মুদ্রা ব্যাংকের জননী। মুদ্রা যেমনি জন্ম দিয়েছে ব্যাংকের তেমনি ব্যাংক আবার মুদ্রাকে করেছে গতিশীল ও অর্থবহ।

ব্যাংক ও এর শ্রেণিবিভাগ অর্থের কাছাকাছি ব্যবহারযােগ্য বিভিন্ন বিনিময় মাধ্যম সৃষ্টি করেছে ব্যাংক। নােট ও মূদ্রার প্রচলনের একক এখতিয়ার সবদেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরই ন্যস্ত।

২. ঋণ ব্যবসায়ের প্রচলন ও ব্যাংক (Introduction of money lending business and banle) : মুদ্রার। প্রচলনের পর ঋণের ব্যবসায়ের প্রচলন ঘটে। একশ্রেণির মানুষের উদ্বৃত্ত অর্থের নিরাপদ সংরক্ষণের যেমনি পােন দেখা দেয় তেমনি আরেক শ্রেণির লােক যারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত তাদের ঋণের প্রয়ােজন পড়ে। আosত এরূপ ঋণ শুধুমাত্র ঋণগ্রহীতার উপকারার্থে প্রদান করা হলেও কালক্রমে অতিরিক্ত পাওনার বিপক্ষে বা সদে ঋণদান শুরু হয়। আর এভাবেই বিভিন্ন সমাজে মহাজন শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এরূপ ঋণের ব্যবসায় যথেষ্ট লাভজনক বিবেচিত হওয়ার বাড়তি ঋণদানের সুবিধার্থে কোনাে কোনাে মহাজন যাদের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে তাদের নিকট হতে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালায়। আর এভাবেই প্রাপ্ত সুদের একটা অংশ আমানতকারী বা অর্থ সরবরাহকারীদেরকে প্রদানের। নিয়ম চালু হয়ে যায়। এভাবেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমাজে ব্যাংক ব্যবসায়ের প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটে।

৩. সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও ব্যাংক (Evolution of civilisation and bank) : সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারার সাথে সঙ্গতি রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের যেমনি উন্নয়ন ঘটেছিল তেমনি ব্যাংক ব্যবসায়েরও উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায় । নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সভ্যতাকালে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রকৃতি তুলে ধরা হলাে:  

  • ক) সিন্ধু সভ্যতা (The indus civilisaion) : খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে সিন্ধু সভ্যতাকালে এ অঞ্চলের সাথে

গ্রীস, রােম ও মিশরের বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময়ে মুদ্রার প্রচলন ছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে প্রমাণ রয়েছে। এতে সেখানে ব্যাংক ব্যবসায়ের ন্যায় আমানত সংরক্ষণ, ঋণদান ও

বৈদেশিক বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায় । 

  • খ) ব্যাবিলনীয় সভ্যতা (The babilonian civilisaion) : খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে ব্যাবিলনীয় সভ্যতাকালে

উপাসনালয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায়। পুরােহিতগণ ছিলেন এই ব্যাংকের কেন্দ্রবিন্দু। ঘটেছিল উপাসনালয়গুলাে চোর-ডাকাতের উপদ্রবমুক্ত হওয়ায় এবং এর পুরােহিতগণ সমাজে সৎ ও প্রভাবশালী চিহ্নিত হওয়ার কারণে জনগণ তাদের কাছে উদ্বৃত্ত অর্থ-সম্পদ জমা রাখতাে। পুরােহিতগণ প্রয়ােজনে সেখান থেকে সমাজের সৎ ও অভাবগ্রস্ত লােকদের ঋণ দিতেন । ফরাসি লেখক রেবিলপট-এর লেখনী থেকে জানা যায়, ব্যাবিলনে এই প্রাথমিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা যথেষ্ট দক্ষ ছিল। জমা

রসিদ, চেক, নােটস ইত্যাদির প্রচলনও সেখানে ছিল বলে জানা যায় ।। 

  • গ) বৈদিক যুগ (The vedic civilisalon): খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১০০০ অব্দ পর্যন্ত সময়কালে এই ভারতীয়

উপমহাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছিল বলে জানা যায় । হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ ও মনুতে ঋণ ও সুদের ব্যবসায় এখানে চালু ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। এ সকল ধর্মগ্রন্থে আমানত ও ঋণ সম্পর্কে নানাবিধ বিধি

বিধানেরও উল্লেখ লক্ষণীয় ।। 

  • ঘ) রােমান সভ্যতা (The roman civilisaion) : খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে রােমান সভ্যতাকালে সেখানকার

বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে সাত পাহাড়ের ব্যবসায়ীগণ অত্যন্ত নিয়মমাফিকভাবে অর্থের ব্যবসায় করতাে বলে। জানা যায়। তখন অর্থ উত্তোলন ও ব্যবসায়িক লেনদেন নিমিত্তে চেক ও ব্যাংক ড্রাফটের ন্যায় দলিলের প্রচলন ঘটেছিল । ঋণের ব্যবসায় তখন এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল যে, সেখানে ঋণ সরবরাহের।

নিমিত্তে ঋণদানকারী ব্যাংক (Loan Bank) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায় ।।

  •  ঙ) চৈনিক সভ্যতা (The chainese civilisation) : খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে চৈনিক সভ্যতাকালে সেখানে

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি । সে সময়ে প্রতিষ্ঠিত “শানসি ব্যাংক’-কে অনেকেই বিশ্বের সবত্রন সংগঠিত ব্যাংক বলে মনে করেন। মুদ্রা প্রচলনের দায়িত্ব এই ব্যাংক পালন করতাে। এ ছাড়া আমানত সংরক্ষণ ও ঋণদানের মতাে গুরুত্বপূর্ণ কার্যাদিও এই ব্যাংক সম্পাদন করতাে।

উপরােক্ত সভ্যতার বাইরেও গ্রীক সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, মেসােপটেমিয়ান সভ্যতা, পারস্য সভ্যতা ইত্যাদি কালে ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নের সাথে অর্থ ও ঋণের ব্যবসায়ের প্রসার লাভ ঘটেছিল ৫ বলে জানা যায়। মিশরীয় সভ্যতাকালে ফারাওগণ এবং মেসােপটেমিয়ান সভ্যতাকালে সাদ্দাদ ও নমরূদদের সম্পর্কে যে তথ্য জানা যায় তা থেকে তখন অর্থের ব্যাপক প্রচলন ও সেই সাথে ঋণের ব্যবসায় চালু ছিল বলে তথ্য মিলে। সম্প্রতি সৌদি আরবে এক প্রত্নতাত্ত্বিক খননকালে কয়েক হাজার বছর পূর্বের হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর আমলের কথিত যে লুক্কায়িত ধনসম্পদ ও স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে তা থেকেও তখনকার আমলে অর্থের ব্যাপক প্রচলন ও একইভাবে ঋণের ব্যবসায় প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়।

৪. ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ও ব্যাংক (Development of business and bank) : ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের সাথে ব্যাংক ব্যবসায়ের উৎপত্তি ও উন্নয়নের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন সভ্যতাকালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল বলে জানা যায়। ফলে তখন অর্থ ও ঋণের ব্যবসায়েও উন্নতি ঘটে। যখন থেকে এক দেশের বণিক সম্প্রদায় অন্যদেশে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে গমনাগমন শুরু করে তখন থেকেই মুদ্রার বিনিময় ব্যবসায়ের প্রচলন শুরু হয়। নির্দেশপত্রের মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে মুদ্রা পাঠানাের যে পদ্ধতি মধ্যযুগে ইহুদি ব্যবসায়ীগণ চালু করেন তা ব্যবসায়ের প্রয়ােজনেই শুরু হয়েছিল । এর পথ ধরেই ব্যাংক নােট, প্রত্যয়পত্র, ভ্রমণকারী চেক ইত্যাদির প্রচলন ঘটে। দেশে-বিদেশে শাখা ব্যাংক বা প্রতিনিধি নিয়ােগের পদ্ধতি চালু হয়। মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কাগজী নােটের প্রচলন ঘটে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ই সরকারের সহায়তায় আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়ের উৎপত্তি ঘটে।

৫. রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংহতি ও ব্যাংক (Integration in state and bank) : রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংহতির সাথে ব্যাংক ব্যবসায়ের উন্নয়নের সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। প্রাচীন যুগে রাষ্ট্র ব্যবস্থা তততা সংহত ছিল না । রাজা বা সমাজপতিগণ সমাজের নেতৃত্ব দিতেন বটে তবে তাদের প্রধান কাজ ছিল রাজত্বকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে খাজনা ও কর আদায় এবং তা থেকে প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নির্বাহই ছিল মুখ্য। যুদ্ধ-বিগ্রহ বৃদ্ধি পেলে রাজা-বাদশাহগণ খাজনা ও কর বৃদ্ধি করতেন। তবে তাৎক্ষণিক প্রয়ােজনে ঋণের জন্য মহাজন ও ব্যবসায়ী শ্রেণির শরণাপন্ন হতেন। এরাও অধিক সুবিধা লাভের প্রত্যাশায় ক্ষেত্রবিশেষ সরকারের অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়ার জন্য খাজনা ও কর আদায়ের দায়িত্ব নিতেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে যখনই কোথাও রাষ্ট্রযন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে তখনই সেখানকার সরকার জনগণের উন্নয়নে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মপন্থা গ্রহণের চেষ্টা করেছে। ইসলামী শাসন আমলে বায়তুলমাল’ প্রতিষ্ঠা তারই প্রমাণ। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে চীনে শালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পিছনেও রাষ্ট্রের সংহতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যযুগের মাঝামাঝিতে ইউরােপের কতিপয় দেশে রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনেকটা সংহত হয়। মুদ্রার প্রচলনকে অর্থবহ করার স্বার্থে এবং সরকারের পক্ষের মূল্যবান সম্পদাদি সংরক্ষণ, খাজনা ও কর আদায়, হিসাবপত্রাদি সুষ্ঠু সংরক্ষণ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার লক্ষ্যে কোনাে কোনাে সরকার এগিয়ে আসে। ১১৫৭ সালে। ব্যাংক অব ভেনিস, ১১৭৮ সালে ব্যাংক অব সানজর্জিও এবং ১৪০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক অব বার্সিলােনা প্রতিষ্ঠার পিছনে রাষ্ট্রের বা সরকারের সক্রীয় ভূমিকা লক্ষণীয়। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে কোনাে কোনাে দেশে ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় সরকারি সনদ প্রদান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এজন্য আইন প্রণয়নের প্রয়ােজনেও সরকার এগিয়ে আসে। ফলে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। দ্রুত নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করতে থাকে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে। আরাে সংহত হলে উনবিংশ শতকের শুরুতেই বিভিন্ন দেশে সরকারের নিজস্ব প্রচেষ্টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংহতির সাথে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন দেশে ব্যাংক ব্যবস্থা আধুনিক রূপ লাভ করে।

৬. জুগের ক্রমধারায় ব্যাংক (Bank through different ages) : ব্যাংক ব্যবসায়ের ক্রমােন্নয়নের হাতহাসে বিভিন্ন পর্যায় ও দিক উপরে বর্ণিত শিরােনামগুলােতে তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিভিন্ন যুগে ব্যাংক ব্যবসায়ে ক্রমােন্নয়নের একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা তুলে ধরা হলে তা এ বিষয়ের জ্ঞানকে আরাে সুসংহত করবে বলে মনে হয়।

রেখাচিত্রের সাহায্যে যুগের ক্রমধারায় ব্যাংক ব্যবসায়ের উন্নয়নের একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলাে :

জুগের ক্রমধারায় ব্যাংক

চিত্র : যুগের ধারাবাহিকতায় ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়ন গতিধারা (রেখাচিত্রটি বিশিষ্ট ব্যাংক বিষয়ক লেখক ডঃ এ. আর. খান-এর উচ্চতর মৌলিক ব্যাংকিং বই অবলম্বনে সাজানাে। হয়েছে।)

উপরােক্ত আলােচনার আলােকে পরিশেষে বলা যায়, ব্যাংক ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তন ও ক্রমােন্নয়নের ইতিহাস মানব সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসের মতােই প্রাচীন। প্রাচীন যুগের মহাজনী ব্যবসায়ের পথ ধরে পরবর্তী সময়ে মুদ্রা ও । ঋণের ব্যবসায়ের প্রচলন ঘটে। পরবর্তী সময়ে কল্যাণধর্মী ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবসায়ের। প্রচলন হয়। বর্তমানে ব্যাপক বিস্তৃত বিশেষায়িত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ব্যাংকের উন্নয়নের এক ধারাবাহিক দীর্ঘ। প্রচেষ্টার সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি। যুগের প্রয়ােজনেই ব্যাংক ব্যবস্থা বিভিন্ন রূপে, বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে । তথাপিও আমানত সংরক্ষণ ও ঋণদানের মত পুরােনাে দিনের সেই মৌলিক ব্যাংকিং কার্যক্রম অদ্যাবধি ব্যাংকের আসল। পরিচয়ই বহন করে। এজন্য হ্যারল্ড ওয়ালগ্রেন বলেছেন, “The what of banking has not changed, merely as much as how.”

১.০১ ভূমিকা।
১.০২ ব্যাংকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস ।
১.০৩ আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তনে উল্লেখযােগ্য ।
১.০৪ ব্যাংকের সংজ্ঞা ।
১.০৫ ব্যাংক ও ব্যাংকিং এর মধ্যে পার্থক্য।
১.০৬ ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য।
১.০৭ একটি আদর্শ ব্যাংকের অত্যাবশ্যকীয় গুণ বা ।
১.০৮ ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি১.০৯ ব্যাংকের কার্যাবলি।
১.১০ আধুনিক ব্যাংকের মূলনীতি।
১.১১ কোনাে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকের গুরুত্ব।
১.১২ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকের ভুমিকা।
১.১৩ ব্যাংকের শ্রেণিবিভাগ।
১.১৪ একক ব্যাংক বা একক ব্যাংকিং-এর সংজ্ঞা।
১.১৫ একক ব্যাংক বা একক ব্যাংকিং-এর বৈশিষ্ট্য
১.১৬ শাখা ব্যাংক বা শাখা ব্যাংকিং-এর সংজ্ঞা।
১.১৭ শাখা ব্যাংক বা শাখা ব্যাংকিং-এর বৈশিষ্ট্য
১.১৯ বাংলাদেশে শাখা ব্যাংক ব্যবস্থা জনপ্রিয়তা লাভের | 
১.২০ গ্রুপ ব্যাংকিং-এর সংজ্ঞা।
১.২১ গ্রুপ ব্যাংকিং-এর বৈশিষ্ট্য ।
১.২২ চেইন ব্যাংকিং-এর সংজ্ঞা কতকগুলাে প্রাচীন ব্যাংক|
১.২৩ চেইন ব্যাংকিং-এর বৈশিষ্ট্য।
১.২৪ খুচরা ব্যাংক বা খুচরা ব্যাংকিং ।
১.২৫ খুচরা ব্যাংকের সেবা সুবিধাসমূহ ।
১.২৬ পাইকারি ব্যাংক বা ব্যাংকিং-এর সংজ্ঞা।
১.২৭ পাইকারি ব্যাংকের সেবা সুবিধাসমূহ বৈশিষ্ট্য।
১.২৮ আমানত ব্যাংকিং।
১.২৯ বিনিয়ােগ ব্যাংকিং এর সংজ্ঞা 
১.৩০ মিশ্র ব্যাংকিং-এর সংজ্ঞা
১.৩১ মার্চেন্ট ব্যাংকিং
১.৩২ যােগাযােগ বা সমন্বয় ব্যাংকিং 
১.৩৩ অফশাের ব্যাংকিং
১.৩৪ ইসলামী ব্যাংকিং 
১.৩৫ লিড ব্যাংকিং
১.৩৬ গ্রীণ ব্যাংকিং
১.৩৭ তালিকাভুক্ত ব্যাংক
১.৩৮ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকাভুক্তির শর্তাবলি ১৯৪একক ব্যাংকিং ও শাখা ব্যাংকিং-এর মধ্যে পার্থক্য
১.৩৯ বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ।
১.৪০ উত্তর সংক্ষেপ কারণ

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here