বীমা | বীমা কাকে বলে | বীমার গুরুত্ব | বীমার সুবিধা

0
489

১.১ ভূমিকা

Introduction জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবন ও সম্পত্তি ঘিরে নানান ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান। মানুষের জীবনের ওপর যেকোনাে সময় নেমে আসতে পারে অজানা বিপদ ও দুর্ঘটনা। এর ফলশ্রুতিতে ব্যাহত হতে পারে মানুষের জীবনের অস্বাভাবিকতা। 

সকল সুখ-আহ্লাদ নিমেষে পরিণত হতে পারে দুঃখের সাগরে। কখনও বা হয় করালগ্রাসে গােটা পরিবার দাঁড়ায় অনিশ্চয়তার মুখােমুখি। কখনও তার সারা জীবনের অর্জিত সহায়-সম্পত্তি দুর্ঘটনা বা ক্ষয়ক্ষতির শিকার। 

জীবন ও সম্পত্তির শােক ব্যক্তিজীবনকে করে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। মানুষের জীবন ও সম্পদকে ঘিরে থাকা এরূপ ঝুঁকি আবহমানকাল হতে মানুষ সহজভাবে মেনে আসলেও সমাজ। 

শক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশের ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কারও মৃত্যু বা কোনাে খাতে ব্যক্তিজীবনকে মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন না করে এজন্য মানুষ এক ধরনের ব্যবস্থা বা

ব্যাংকিং ও বিমা তত্ত্ব, আইন ও হিসাব গড়ে তােলে আর একেই বিমা বলা হয়ে থাকে । 

বিমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে Mr. Porter বলেন, “মানব জীবন ও ব্যবসাকে ঘিরে রেখেছে এমন বিপদের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতিকার বিধান করাই বলা আর্থিক প্রতিকার বিধান করাই বিমার উদ্দেশ্য।”

এ ব্যবস্থা কোম্পানির কাজ হলাে আর্থিক প্রতিদান বা প্রিমিয়ামের বিনিময়ে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বা সহায়-সম্পদের ঝকি গ্রহণ করা এবং চুক্তিতে উল্লিখিত কারণে ঝুঁকির উদ্ভব হলে সেজন্য চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক ক্ষতিপূরণ করা।

পঞ্চদশ শতকের পর ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌপথে মালামাল পরিবহনে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় । মূলত ব্যবসায়ীদের এরূপ ক্ষতির হাত থেকে নিষ্কৃতি প্রদানের জন্য লাভজনক ব্যবসায় জন্য লাভজনক ব্যবসায় হিসেবে বিমা কোম্পানি গুলো উঠতে থাকে। 

শিল্প বিপ্লবের পর সারা বিশ্বে বিমা ব্যবসায় অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নৌ পরিবহনে উদ্ভূত ক্ষতির বিপক্ষে নৌ-বিমা, অগ্নিজনিত ক্ষতির বিপক্ষে অগ্নিবিমা, মানুষের জীবনকে নিয়ে জীবন বিমা এবং বিভিন্ন ধরনের ” বনাম অচলন ঘটে। এভাবেই বিমার আওতা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন নতুন বিমা পলিসির উদ্ভব হয়। । 

বিমা হলাে বিমা কোম্পানি ও বিমাগ্রহীতার মধ্যে এক ধরনের চুক্তিবিশেষ। তাই এরূপ চুক্তিকে অর্থবহ ও আইনানুগ করার জন্য অনেক পূর্ব হতেই আইনের প্রয়াগ লক্ষনীয়। শুরুতে এই উপমহাদেশে ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের আওতায় বিমা চুক্তি গঠন ও পরিচালনা করা হতাে। কিন্তু পরবর্তীতে বিমার ব্যাপক প্রচলন ঘটলে এজন্য পৃথক আইন প্রণয়নের প্রয়ােজন দেখা দেয়। এ লক্ষ্যেই ১৯১২ সালে উপমহাদেশে স্বতন্ত্র দুটি আইন পাস করা হয়। এবং ১৯৩৮ সালে উক্ত দু’টি আইনের স্থলে The Insurance Act, 1938 সংশােধিত আকারে গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে বাংলাদেশের সংসদে নতুন বিমা আইন ২০১০ (The Insurance Act, 2010) পাস হয়; যা বর্তমানে দেশে প্রচলিত রয়েছে ।

১.২ বিমার সংজ্ঞা

Definition of Insurance কারাে ব্যক্তিজীবন বা সম্পত্তির ঝুঁকি মােকাবিলার প্রক্রিয়াই হলাে বর্তমানকালের বিমা ব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত। জীবন ও তার সহায়-সম্পদ সকল সময়ই ঝুঁকি দ্বারা পরিবেষ্টিত। মানুষকে এই সকল ঝুঁকির হাত থেকে আর্থিক । নিষ্কৃতি বা আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে যে ব্যবস্থা গৃহীত হয় তাকে বিমা বলা হয়ে থাকে।

বিমা হলাে এক ধরনের লিখিত চুক্তি যেখানে বিমাপত্রগ্রহীতা নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম বা সেলামির বিনিময়ে তার সম্ভাব্য ঝুঁকি বা বিপদের ভার বিমাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করে। অন্যদিকে বিমাকৃত জীবন বা সম্পত্তির চুক্তিতে উল্লিখিত কোনাে কারণে ক্ষতি বা হানি হলে বিমাকারী আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়।

বিভিন্ন লেখক ও বিমা বিশেষজ্ঞগণ বিমাকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। নিম্নে তার কতিপয় উল্লেখ করা হলাে :

  • বিমার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে M. K. Ghosh & A. N. Agorwala বলেন, “বিমা হলাে এমন একটা যৌথ | ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ঝুঁকির আওতাধীন বা ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে এমন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ঝুঁকি বণ্টন করা হয় ।” (“Insurance is a co-operative form of distributing a certain risk over a group of persons who are exposed to it.”)।

M. N. Mishra বলেন, “বিমা বলতে এমন একটা সহযােগিতামূলক ব্যবস্থাকে বােঝায় যার মাধ্যমে কোনাে নির্দিষ্ট ঝুঁকির কারণে সৃষ্ট ক্ষতিকে এমন সব ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বণ্টন করা হয়; যারা উক্ত ক্ষতির কারণে দুর্দশাগ্রস্ত হয় এবং যারা উক্ত ঝুঁকির বিপক্ষে নিশ্চয়তা বিধানে সম্মত হয়।” (“Insurance is a co-operative | device to spread the loss caused by a particular risk over a number of persons, who are exposed to it and who agree to insure themselves against the risk”.)!

  • জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া-এর মতে, “বিমা হলাে দু’পক্ষের মধ্যে এমন একটা চুক্তি, যদ্বারা এক পক্ষ একটা ৪ পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করার পরিবর্তে কোনাে ক্ষতিকর ঘটনায় (মনুষ্য জীবনের ক্ষেত্রে মৃত্য) বা একটা নির্দিষ্ট ২য় পৌছলে অন্য পক্ষকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশােধ করতে অথবা (সম্পত্তির ক্ষেত্রে) বিমাকত চর জারা যদি কোনাে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, সেক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতির টাকা পরিশােধ করার অঙ্গীকার প্রদান করে।”

উপরােক্ত আলােচনা ও সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে বিমার নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যাবলি লক্ষ করা যায় :

  • মানষের জীবন ও সম্পদকে ঘিরে যে ঝুকি বিদ্যমান তার হানি বা ক্ষতির বিপক্ষে বিমা হলাে এক ধরনের আর্থিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। 
  • বিমা এক ধরনের যৌথ ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ঝুঁকির আওতাধীন সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঝুঁকি বণ্টনের সুযােগ সৃষ্টি হয়।
  • বিমা ব্যবস্থায় বিমাগ্রহীতার স্বার্থ হলাে জীবন ও সম্পত্তির ঝুঁকি অন্যের ওপর অর্পণ করা এবং 
  • বিমাকারীর স্বার্থ হলাে এককালীন বা নির্দিষ্ট মেয়াদ পরে পরে বিমাগ্রহীতা থেকে প্রিমিয়াম লাভ করা ।
বিমা বা বিমা ব্যবসায়ের ক্রমােন্নয়ন

১.৩ বিমা বা বিমা ব্যবসায়ের ক্রমােন্নয়ন

Evolution of Insurance Insurance Business মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ঝুঁকি নতুন কোনাে বিষয় নয়। কোনাে ব্যক্তির অকালমৃত্যু বা সহায়-সম্পত্তির ক্ষতি ব্যক্তিজীবনে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাই এরূপ অসহায়ত্ব বা বিপর্যয় থেকে মুক্তির বিষয়টি মানুষ ভেবেছে সব সময়ই। 

বিভিন্ন সভ্যতাকালে মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য নানা ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারােপ করা হলেও আর্থিক ক্ষতিপূরণের বর্তমান এ বিমা ব্যবস্থার বিষয়টি একান্তই বর্তমানকালের । নিম্নে বিমা ব্যবসায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস সংক্ষেপে আলােচনা কর হলাে :

ক) প্রাচীন যুগে বিমা ব্যবসায় (Insurance at Initial or Ancient Period) :

প্রাচীনকালে বিমার উৎপত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনাে ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন সভ্যতাকালে ব্যবসায়ী শ্রেণি সহায়-সম্পদ ও জানমাল রক্ষায় বিমা ব্যবস্থার মতাে বিষয়কে নিয়ে চিন্তা করেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় । খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ অব্দে ভূমধ্যসাগরের দেশগুলােতে যে সকল সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল (গ্রীক সভ্যতা, ব্যবিলনীয় সভ্যতা ইত্যাদি) তখন সেখানকার ব্যবসায়ীগণ নিজেদের স্বার্থরক্ষাকল্পে সমবায়ের প্রকৃতিতে এক ধরনের বিমা পদ্ধতির প্রচলন ঘটিয়েছিল। 

তখনকার সময়ে ব্যবসায়ী বা জাহাজের কাপ্তানগণ Bottomury Bonds ও Responditia Bonds (বিপদের ফলশ্রুতিতে ঘটে যাওয়া ক্ষতিপূরণে নিশ্চয়তাপত্র)-এর ন্যায় বিভিন্ন Bonds-এর প্রচলন ঘটিয়েছিল বলেও জানা যায়। এ থেকে বিমা ব্যবস্থার মতাে একটা ব্যবস্থা সম্পর্কে তখনকার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যে ভাবতেন তার প্রমাণ।

মিলে ।

খ) মধ্যযুগে বিমা ব্যবসায় (Insurance in the Middle Age) : মধ্যযুগের শেষার্ধে ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমা ব্যবসায়ের উদ্ভব ঘটে। এ সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে তুলে

ধরা হলাে:i) ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিমা (Insurance in the area of editerial sea) : মধ্যযুগের মাঝামাঝি সময়। এখকে নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ভূমধ্যসাগরের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ; বিশেষত- ফ্রান্স, ইটালি, পন, তুরস্ক ইত্যাদি দেশগুলােতে নৌ-বাণিজ্য প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, ১১৮২ সালে।

ফান্স হতে বিতাড়িত ইহুদি ব্যবসায়ীগণ ইটালিতে এসে সর্বপ্রথম বিমা ব্যবসায়ের প্রচলন ঘটায়। এ সময়ে নৌপথে পেরণে প্রাকৃতিক ও প্রাকৃতিক নানান ধরনের ঝুঁকি বিদ্যমান থাকায় জাহাজ ও পণ্যের নিরাপত্তায় কি করা যায়— এ বিষয়ে ব্যবসায়ী শ্রেণি খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজ রক্ষার জন্য নিরাপত ব্যবস্থা করা হলেও দীর্ঘ নৌপথে তা কার্যকরী কোনাে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। 

পরবর্তীতে একই বছরে (a. কোনাে জাহাজ বা তার মালামালের ক্ষতি হলে বহরের অন্যান্য জাহাজ ও পণ্যের মালিকদের নিকট হতে একটা সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তােলা হয় । কিন্তু তাও নানান কারণে ফলপ্রসূ হয়নি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যবসায়ীগ প্রথমত এক ধরনের সমবায় প্রথা গড়ে তােলে। এতে জাহাজ ও পণ্যের মালিকগণ যাত্রা শুরুতেই নির্দিষ্ট হাৱে চাদা একটা তহবিলে জমা করতাে এবং কোনাে ক্ষতি হলে তা ঐ তহবিল থেকে পূরণের ব্যবস্থা করা হতাে।

 পরবর্তীতে এই সমবায় ব্যবস্থা লাভজনক বিবেচিত হয় এবং নৌ-বিমার প্রচলন ঘটে । এরূপ বিমা ব্যবসায় ১২০০ শতাব্দীতে ভূমধ্যসাগরীয় দেশসমূহ ছাড়াও ইউরােপে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রখ্যাত ৰিমাৰিশারদ II. L. Cockrell এ সম্পর্কে বলেছেন, “নৌ-বিমা ইটালিতে জন্মলাভ করলেও তা ইউরােপীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলােতে প্রসার লাভ করে । তবে নির্ভরযােগ্য তথ্য হতে জানা যায়, নৌ-বিমাপত্র সর্বপ্রথম ইস্যু হয় ইটালির জেনােয়াতে।”

ii) ইংল্যান্ডে বিমা ব্যবসায় (Insurance in England) : ১৩০০ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইটালি থেকে বিতাড়িত ইহুদি ব্যবসায়ীদের একটি দল (যারা লােম্বার্ড বলে পরিচিত) ইউরােপের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করে এবং এদেরই। একটি দল লন্ডনে এসে সর্বপ্রথম ব্রিটেনে বিমা ব্যবসায়ের প্রচলন ঘটায়। এ সকল ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টায় মধ্যযুগের শেষ দিকে লন্ডনের লােম্বার্ড স্ট্রিট বিমা ব্যবসায়ের কেন্দ্রে পরিণত হয় । ১৬৬৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিমা ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে এরূপ ব্যবসায়ের উন্নয়ন ঘটতে থাকলেও এর পরে লন্ডনের এডওয়ার্ড লয়েড়স (Edward Lloyd’s) নামক একজন ব্যবসায়ীর বিশেষ উদ্যোগে বিমা ব্যবসায়ের গুণগত পরিবর্তন ঘটে । লন্ডনে তিনি একটা কফিখানা পরিচালনা করতেন। তাঁর কফিখানাতে বিভিন্ন দেশের নাবিকদের ব্যাপক সমাবেশ ঘটতাে। মি: লয়েড়স তার ব্যক্তিগত উৎসাহের কারণে বিদেশী কোনাে জাহাজ কখন লন্ডন বন্দরে আসছে, কখন ছেড়ে যাচ্ছে, কোত্থেকে আসছে, কোথায় ছেড়ে যাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন । ফলে নাবিকগণ তাঁর নিকট হতে বিভিন্ন তথ্য পেয়ে উপকৃত হতে থাকে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশী-বিদেশী নাবিকগণ ও ব্যবসায়ীদের নিকট সংবাদ সংগ্রাহক হিসেবে স্বীকৃতি ও ক্ষেত্রবিশেষে নিযুক্তি লাভ করেন । ডাক ও তারবিহীন সে সময়ে তিনি সাংকেতিক চিহ্নের সাহায্যে দূরদূরান্ত হতে তথ্য সংগ্রহ করে তা নাবিক ও ব্যবসায়ীদের নিকট সরবরাহ করতেন। এ সময়ে তিনি ইউরােপের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজের গতিবিধি ও বিভিন্ন বিনিময় হার সম্বলিত Lloyd’s List নামে একখানি সাময়িকীও প্রকাশ করেন। এরূপ সুবিধা নাবিকদের পক্ষে অপরিহার্য বিবেচিত হওয়ায় এই কফিখানা দ্রুত বিমা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। বিমার দায় গ্রাহকগণ এই কফিখানাকেই তাদের যােগাযােগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

iii) বিমা ব্যবসায়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Institutionalisation of insurance business): ১৭২০ সালে রাজকীয় সনদ বলে “The Lloyd’s Assurance’ এবং ‘The Royal Exchange’ নামে দুটি বিমা কোম্পানি গাইত হয়। ১৭৭১ সালে নৌ-বিমার দায়গ্রাহকগণ ও দালালগণ একত্রিত হয়ে ‘Association of Lloyd’s Underwriter নামে একটি বিমা সমিতি গঠন করেন । ১৭৭৪ সালে তারা সমিতির সদস্য প্রথার প্রবর্তন করেন এবং ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিমাপত্রের গঠন প্রণালী নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন । এটিই পৃথির সর্বত্র বিমা কোম্পানি ।

১৮২৪ সালে লয়েডস-এর বিমা ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টায় Alliance Assurance Co. Ltd. নামে আরেকটি কে গঠিত হয়। ১৮৭১ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট লয়েডস-এর ব্যবসায়ীগণ ১৭৭১ সালের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিকে “The Corporation of Lloyd’s নামে পুনর্গঠিত করেন ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দান করেন। লয়েডসগণের প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি অদ্যাবধি বিশ্বের বৃহত্তম বিমা প্রতিষ্ঠান। নৌ-বিমা ব্যবসায়ের উদ্ভবের পর মধ্যযুগের।

পর্যায়ে এসে বিমা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি অগ্নিবিমার প্রতি আকৃষ্ট হয় । ১৬৬৬ সালে লন্ডনে খুব বড় একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটে। দিন ধরে চলা এ অগ্নিকাণ্ডে ১৩ হাজার দালান-কোঠা ধ্বংস হয়ে যায়। আর এর ফলে বিমা ব্যবসায়ের নিয়ে ব্যাপক চিন্তার উন্মেষ ঘটে। এর মধ্যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়ে যায় 

(Insurance during Industrial Revolution): নিপৰের মলে ছিল যান্ত্রিক সভ্যতার সূচনা। কতকগুলাে নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে ১৭৫০ সাল থেকে জাের মধ্যে বিটেনসহ ইউরােপের দেশগুলােতে উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয় ও বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। ফলে নৌ-বিমার পাশাপাশি অগ্নিবিমার প্রচলনও ব্যাপকতর হয় । ইউরােপের চৌহদ্দি এ সময় নৌ-বিমা ও অগ্নিৰিমা পৃথিবীর দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ সময়ে বিমা ব্যবসায়ে যে নতুন। পরিবর্তন সাধিত হয় তা নিয়ে তুলে ধরা হলাে:

1) জীবন বিমার প্রচলন (Introduction of life insurance) : শিল্প বিপ্লবের ফলে আবহমানকাল থেকে চলে আসা যৌথ পারিবারিক প্রথায় ভাঙনের সৃষ্টি হয় । কৃষিভিত্তিক অর্থব্যবস্থার বিপক্ষে শিল্পভিত্তিক অর্থব্যবস্থার প্রচলন ঘটে । মানুষ শহরে ও শিল্পাঞ্চলে এসে ভিড় জমাতে থাকে। ভােগের ক্ষেত্রে নতুন নতুন মাত্রা যােগ হয়। জীবনযাত্রার। ব্যয় বেড়ে যায়। 

পরিবারগুলাে ভেঙে ছােট হয়ে যায় । চাকরিজীবী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আয় উপার্জন বাড়লেও কোনাে ব্যক্তির অকালমৃত্যু বা কোনাে ধরনের দুর্ঘটনার কারণে তার সন্তান-সন্ততি অরক্ষিত হয়ে পড়ে । এ অবস্থা থেকে সন্তান-সন্ততিকে রক্ষার তাগিদে মানুষের জীবনকে নিয়ে বিমা করার প্রয়ােজন দেখা দেয় এবং জীবন বিমার প্রচলন ঘটে । অবশ্য ষােড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে স্বল্পমেয়াদি জীবন বিমার প্রচলন ঘটেছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায় । 

ব্রিটিশ জাদুঘরে রক্ষিত এক জীবন বিমাপত্রে দেখা যায়, রিচার্ড মার্টিন নামক একজন বিমা ব্যবসায়ী উইলিয়াম গিবস নামক এক ব্যক্তির জীবন ১২ মাসের জন্য বিমা করেছিলেন এবং অষ্টাদশ শতকের শুরুতে। জীবন বিমা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়াসে ব্রিটেনে দু-একটা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছিলে । তথাপিও শিল্প বিপ্লবের প্রারম্ভে ১৭৫০ সালের দিকে মৃত্যুহারপঞ্জির ব্যবহার শুরু হওয়ায় জীবন বিমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগে । 

মেয়াদি বিমা ও পরবর্তীতে আজীবন বিমার প্রচলন ঘটে। ১৭৬২ সালে Equitable Assurance Society নামে একটি জীবন বিমা প্রতিষ্ঠান ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানে সম প্রিমিয়াম পদ্ধতি (Level premium)-তে জীবন বিমা পদ্ধতির প্রচলন ঘটায় । অতঃপর এ পদ্ধতি অনুসরণে ইউরােপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জীবন বিমা দ্রুত ছড়িয়ে

পড়ে।

ii) সামাজিক বিমা ব্যবস্থার প্রচলল (Introduction of Social Insurance) : শিল্প বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে মানুষের সামাজিক জীবনে যে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয় তার পথ ধরে প্রথমে জীবন বিমার প্রচলন ঘটলেও এরপর বিভিন্ন সামাজিক বিমার উৎপত্তি ঘটে । যান্ত্রিক সভ্যতার ফলে দুর্ঘটনার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন পেশাজনিত রােগেও মানুষের কর্মক্ষম হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। 

ফলে সর্বপ্রথম জার্মানিতে ১৮৮৩ সালে রুগ্নবিমা, ১৮৮৪ সালে দুর্ঘটনা বিমা ও ১৮৮৯ সালে বিকলাঙ্গ ও বার্ধক্য বিমার প্রচলন ঘটে । এর পূর্বেই ১৮৪০ সালে যৌথ বিশ্বস্ততার বিমা (Corporate Fidelily Boud) চালু হয়। ১৮৯০ সালে স্বত্বাধিকারী বিমার (Title Insurance) উৎপত্তি ঘটে । শস্যতে গবাদিপশুসহ কৃষি বিমারও প্রচলন ঘটে ঠিক একই সময়ে। এ ছাড়া গােষ্ঠী বিমা, যানবাহন বিমা ও অন্যান্য বিবিধ বিমার প্রচলনও এ সময় থেকে শুরু হয়।

ঘ) আধুনিককালে বিমা ব্যবসায় (Insurance in nodern age) : আধুনিককালে বিমা ব্যবসায় এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, পৃথিবীর সব দেশেই বিমা ব্যবসায় অত্যন্ত সমদ্রিত । জীবন বিমা, নৌ-বিমা, অগ্নিবিমা শুধু নয় মানুষের ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন দিক, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হতে শুরু করে

অদৃশ্যমান বিভিন্ন সহায়-সম্পদের জন্য আজ বিমা করা হচ্ছে । 

বিমা শুধুমাত্র কোনাে ঐচ্ছিক বিষয় নয় এটা ‘সুপভাবেই অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মতাে গরিব দেশেও ছােট কারখানা চালাতে গেলে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিবিমা করতে হয়। গাড়ি এমন কি মােটরসাইকেল চালানাের জন্য যানবাহন বিমা করা বাধ্যতামূলক। তাই উন্নত বিশ্বে বিমা কতটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে এ থেকেই তার পরিচয় মিলে । ১৮০০ সালের দিকে নেয়া একটা পরিসংখ্যান হতে জানা যায়, তখন মাত্র ৮টি দেশে ৩০টি বিমা প্রতিষ্ঠান কর্মরত ছিল । অথচ ১৯০০ সালে নেয়া এক পরিসংখ্যানে ২৬টি দেশে ১২৭২টি বিমা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রকাশিত সুইজ-রিইন্সিওরেন্স প্রতিষ্ঠানের পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য হতে জানা যায়, সে সময়ে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বিমা কোম্পানি কর্মরত ছিল এবং সারা বিশ্বে এরূপ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১২,৮৩৮।

আজ এই পর্যন্ত লিখলাম পরর্তি টিউটোরিয়াল পেতে আমাদের সাথে থাকুন আর টিউটোরিয়ালটি সম্পন্ন পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আর আমি Youtube ভিডিও নিয়ে আসছি । আপনারা যদি WordPress Theme Development video টিউটিরিয়াল দেখতে চান তাহলে এই লিঙ্কে চলে আসেন

Our entutorial blog web site

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here