নিউটনের প্রথম গতিসূত্র ও বল এর সংজ্ঞা – পদার্থের জাড্য ধর্ম

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র

বিজ্ঞানী নিউটন পরীক্ষালব্ধ হবে তিনটি গতিসূত্র প্রকাশ করেন। যেগুলি নিউটনের প্রথম গতিসূত্র, দ্বিতীয় গতিসূত্র এবং তৃতীয় গতিসূত্র নামে পরিচিত। এই অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে নিউটনের প্রথম গতিসূত্র উদাহরণসহ আলোচনা করা হল —

একটি ক্রিকেট বল ছুড়ে দিলে কিছুদুর গিয়ে থেমে যায়। আবার মহাকাশে কোন বস্তু ছুড়ে দিলে চিরস্থায়ীভাবে সরলরেখা বরাবর চলতে থাকে । এই ঘটনা কেন ঘটে, এর পিছনের যুক্তি কি তা জানতে আমাদেরকে নিউটনের প্রথম গতিসূত্র কে ভালোভাবে অধ্যায়ন করতে হয়।

কিন্তু তার আগে বল কি সে সম্বন্ধে একটি ধারণা আমাদের থাকা বিশেষ প্রয়োজন।

বল কাকে বলে বা বলের সংজ্ঞা

যা দ্বারা কোন বস্তুর স্থিতি বা গতিশীল অবস্থার পরিবর্তন করা যায় বা করার চেষ্টা করা হয় তাকে বল বলে।

কোন বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করলে বস্তুটির স্থিতি ও গতি কেমন হবে কি পরিমান বল প্রয়োগ করলে বস্তুটির মধ্যে কিরকম গতি সৃষ্টি হবে এইসব প্রশ্নের উত্তর নিউটনের গতি সূত্র থেকে পাওয়া যায়।

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র কাকে বলে

বাইরে থেকে প্রযুক্ত বল দ্বারা অবস্থার পরিবর্তনে বাধ্য না হলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির অবস্থায় থাকবে এবং সচল বস্তু সমবেগে সরলরেখা ধরে চলতে থাকবে।

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে দুটি বিষয় জানা যায় যথা ১. জাড্য পদার্থের একটি মৌলিক ধর্ম বা পদার্থের জাড্য ধর্ম এবং ২. বলের সংজ্ঞা

পদার্থের জাড্য ধর্ম

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র বলা হয়েছে যে, কোন জড় বস্তু যদি স্থির অবস্থায় থাকে তাহলে বাইরে থেকে ওর উপর বল প্রযুক্ত না হলে বস্তুটি নিজে থেকে ওর স্থির অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না। অর্থাৎ স্থির বস্তুর ধর্ম হল চিরকাল স্থির থাকা।

আবার জড় বস্তুর যদি গতিশীল অবস্থায় থাকে তাহলে বাইরে থেকে ওর উপরে বল প্রযুক্ত না হলে বস্তুটির নিজে থেকে ওর গতিশীল অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না। অর্থাৎ গতিশীল বস্তুর ধর্ম হল চিরকাল সমবেগে সরলরেখা বরাবর চলা।

পদার্থের জাড্য ধর্মের সংজ্ঞা (নিউটনের প্রথম গতিসূত্র)

যে ধর্মের জন্য জড় পদার্থ যে অবস্থায় আছে তার সেই অবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করে সেই ধর্মকে পদার্থের জাড্য ধর্ম বলে।

পদার্থের জাড্য ধর্ম ভরের সঙ্গে সমানুপাতিক। অর্থাৎ জড় যত বেশি হবে পদার্থের জাড্য ধর্মও তত বেশি হবে। তাই কোনো ভারী বস্তুকে অচলাবস্থা থেকে সচল অবস্থায় আনতে বেশি বল প্রয়োগ করতে হবে কিংবা কোন গতিশীল ভারী বস্তুকে অচল অবস্থায় আনতে বেশি বল প্রয়োগ করতে হয়।

জাড্য ধর্ম পরিমাপ করলেই বস্তুর ভর পাওয়া যায়। জাড্য ধর্ম দু’রকম যথা ১. স্থিতি জাড্য এবং ২. গতিজাড্য

স্থিতি জাড্য
স্থিতি জাড্য

স্থিতি জাড্য কি বা কাকে বলে

জড় পদার্থের স্থিতি জাড্য ধর্মের অভিজ্ঞতা আমাদের সকলেরই আছে। কোন বস্তুকে কোথাও রাখলে বস্তুটির সেইখানেই পড়ে থাকবে যতক্ষণ না ওকে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে। বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করা পর্যন্ত যে পদার্থ স্থির অবস্থায় আছে তা চিরকাল স্থির অবস্থাতেই থাকবে। কোন জড় পদার্থ নিজে থেকে স্থান পরিবর্তন করতে পারে না।

স্থিতি জাড্য এর সংজ্ঞা

কোন জড় বস্তু যখন স্থির অবস্থায় থাকে তখন বস্তুটির স্থির অবস্থাতেই থাকার একটা প্রবণতা দেখা যায় পদার্থের এই ধর্মকে বলা হয় স্থিতি জাড্য।

স্থিতি জাড্য এর উদাহরণ

১. আমরা বাসে ট্রেনে করে বিভিন্ন জায়গায় যাই। বাসের মধ্যে কিছু ধরে না দাঁড়ালে বাসটি স্থির অবস্থান থেকে যেই মুহূর্তে চলতে শুরু করে ঠিক তখনই আমরা পিছন দিকে হেলে পড়ে যাই। কারণ বাসটি যখন স্থির ছিল তখন আমরাও স্থির ছিলাম।বাসটি হঠাত চলার সঙ্গে সঙ্গে বাসের সঙ্গে সংযুক্ত আমাদের পা সামনের দিকে এগিয়ে যায় কিন্তু দেহের উপরের অংশ স্থিতি জাড্য ধর্মের জন্য আগের জায়গাতেই স্থির থাকতে চায় ফলে কোন অবলম্বন না পেয়ে আমরা পিছন দিকে হেলে পড়ি।

২.একটি পোস্টকার্ড গ্লাসের উপর রেখে ওর উপর একটি পয়সা’ রেখে কার্ডটিকে হঠাৎ সজোরে আঘাত করলে কার্ডটি সরে যায় কিন্তু পয়সাটি স্থিতি জাড্য ধর্মের জন্যই একই স্থানে থাকতে চায় ফলে কোন অবলম্বন না পেয়ে গ্লাসের মধ্যে পড়ে যায়।

৩. একটি কম্বলের ধুলো ঝারার জন্য কম্বলটিকে ঝুলিয়ে একটা লাঠি দিয়ে কম্বলে বারবার আঘাত করা হয়। লাঠি দিয়ে আঘাত করলে লাঠির ধাক্কায় কম্বলটি হঠাৎ সরে যায় কিন্তু ওর গায়ে লেগে থাকা ধূলিকণা গুলি স্থিতি জাড্য ধর্মের জন্য আগের অবস্থানেই থেকে যেতে চায় ফলে কোন অবলম্বন না পেয়ে নিচে পড়ে যায়।

গতি জাড্য কি বা কাকে বলে

একটি লোহার গোলককে মেঝেতে ঘুরিয়ে দিলে লোকটি কিছুদূর গিয়ে থেমে যায়। কিন্তু নিউটনের প্রথম গতিসূত্র অনুযায়ী যে পদার্থ গতিশীল অবস্থায় আছে তা চিরকাল সমবেগে সরলরেখা ধরে চলতে থাকবে যতক্ষণ না ওর উপর বাইরে থেকে বল প্রযুক্ত হবে।এখানে লোহার গোলকটির উপর বাইরে থেকে অভিকর্ষজ বল ও ঘর্ষণ জনিত বল ওর গতির বিপরীত দিকে ক্রিয়া করে ফলে কিছুদুর গিয়ে গতি থেমে যায়। এই বলগুলি যদি লোহার গোলকটির উপর ক্রিয়া না করতো তাহলে গোলকটি চিরকাল সমবেগে সরলরেখা ধরে চলতে থাকতো। সচল বস্তুর এইভাবে সমবেগে সরলরেখা ধরে চলতে থাকার ধর্মকে গতি জাড্য বলে।

গতি জাড্য এর সংজ্ঞা

কোন জড় বস্তু যখন সরলরেখায় সমবেগে গতিশীল অবস্থায় থাকে তখন বস্তুটির সেই অবস্থাতেই থাকার একটা প্রবণতা দেখা যায় অর্থাৎ একই বেগে সরলরেখা ধরে গতিশীল অবস্থায় থাকার একটা প্রবণতা বস্তুটির মধ্যে তৈরি হয় পদার্থের এই ধর্মই হলো গতি জাড্য।

গতি জাড্য এর উদাহরণ

১. চলন্ত বাসের মধ্যে একটি লোক কিছু না ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এখন বাসটির যদি হঠাৎ থেমে যায় তাহলে দেখা যাবে যে, লোকটি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এর কারণ হলো বাসটি গতিশীল থাকার সময় লোকটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমস্ত দেহই গতিশীল অবস্থায় ছিল।

বাসটি হঠাত থেমে যাওয়ায় বাসের সঙ্গে আটকানো পাদুটি হঠাৎ স্থির অবস্থায় আসে, কিন্তু দেহের উপরের অংশ গতি জাড্য ধর্মের জন্য তখনও গতিশীল অবস্থায় থাকতে চায়। তাই সামনের দিকে এগিয়ে যায় ফলে লোকটি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

২. ঘরের মধ্যে ইলেকট্রিক পাখা ঘুরছে।এমন সময় সুইচ বন্ধ করে দিলেও পাখাটি সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে যায় না। অনেকক্ষণ ঘোরার পর একসময় স্থির অবস্থায় আসে। সুইচ বন্ধ করলেও পাখাটা ঘুরতে থাকে ওর গতি জাড্য ধর্মের জন্য।

৩. লম্বা লাফ দেওয়ার সময় আমরা কিছু দূর থেকে দৌড়ে এসে লাফ দিই। এর কারণ দৌড়ে আসার ফলে গতি জাড্য আমাদের বেশিদূর লাফ দিতে সাহায্য করে।

৪. চলন্ত ট্রেন গাড়ি থেকে আমরা যখন আমি তখন পেছন দিকে হেলে নামি। কারণ চলন্ত গাড়িতে থাকার সময় আমাদের দেহ গতিশীল থাকে। গাড়ি থেকে মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পা মাটি স্পর্শ করে এবং স্থির হয়ে যায়। কিন্তু দেহের উপরের অংশ গতি জাড্য ধর্মের জন্য তখনো গতিশীল অবস্থায় থাকে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

পেছনদিকে হেলে না নামলে আমরা সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারি। যাতে হুমড়ি খেয়ে না পড়ি তার জন্য পেছনে হেলে নামতে হয়।এর ফলে দেহের উপরের অংশ কিছুদূর এগিয়ে স্থির হয়ে যায় ফলে সামনের দিকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা।

গতি জাড্য
গতি জাড্য

বল এর সংজ্ঞা

বল কি বা বল কাকে বলে (নিউটনের প্রথম গতিসূত্র অনুযায়ী)

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে আমরা বল সম্বন্ধে ধারণা পাই এবং বলের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে পারি।

বলের সংজ্ঞা

প্রথম সূত্র থেকে আমরা বলের সংজ্ঞা পাই।কোন বস্তুর অচল বাস অচল অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে বস্তুর উপর বাইরে থেকে কিছু প্রয়োগ করতে হয়। কারণ কোনো বস্তুই জাদু ধর্মের জন্য নিজে থেকে নিজের সচল বা অচল অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না। আবার দেওয়ালকে হাত দিয়ে ঠেলে ও সচল হয় না অতএব বলের সংজ্ঞা স্বরূপ বলা যায় যে—

বাইরে থেকে যা প্রয়োগ করে কোন অচলবস্থা দেশ অচল অবস্থায় আনা হয় বা আনার চেষ্টা করা হয় কিংবা সচল বস্তুর গতিপথ পরিবর্তন করা যায় তাকে বল বলে।

বলের মান এবং অভিমুখ দুইই আছে তাই বল একটি ভেক্টর রাশি।

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে কী জানা যায়

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে পদার্থের মৌলিক ধর্ম অর্থাৎ পদার্থের ধর্ম এবং বলের সংজ্ঞা জানা যায়।
যে ধর্মের কারণে স্থির বস্তু চিরকালই স্থির এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সরল রেখায় সমবেগে চলতে চায় সেই ধর্মকে পদার্থের জাড্য ধর্ম বলে।
বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ করার ফলে গতিশীল বস্তু স্থির এবং স্থির বস্তু গতিশীল করতে বাধ্য করা হয় বা চেষ্টা করা হয় তাকে বলে।

বল কি ধরনের রাশি

বলের মান এবং দিক উভয়ই বর্তমান তাই বল একটি ভেক্টর রাশি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment